স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

ফোকাস রাইটিং : ব্লু ইকোনমি
Content Protection by DMCA.com

ফোকাস রাইটিং
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র (২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১)

অভিধাঃ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে শত্রুর বিরুদ্ধে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়ার সমতুল্য বিবেচনা করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে কেউ কেউ “মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আবার কেউ কেউ রণাঙ্গনের ১১ টি সেক্টরের অনুরূপ হিসেবে গণ্য করে একে বলেছেন “দ্বাদশ সেক্টর ”
এর সঙ্গে যুক্তদের “কণ্ঠসৈনিক”, “শব্দসৈনিক ” এমন অভিধায় সম্মানিত করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠাঃ ২৬ মার্চ, ১৯৭১ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র। কিন্তু স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচার শুরু হয়েছিল চট্টগ্রামের কালুরঘাট প্রচার ভবন থেকে একটি ১০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েব ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে।
চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র ছিল আগ্রাবাদে। উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা ছিল হানাদার বাহিনীর যুদ্ধজাহাজের শেলিং য়ের আওতামুক্ত এলাকা থেকে সম্প্রচারকাজ শুরু করা। তাই তাঁরা কালুরঘাটকে বেছে নিয়েছিলেন।

কার্যক্রমঃ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল তিনটি পর্যায়ে।

প্রথম পর্বঃ চট্টগ্রামের কালুরঘাট। পাকিস্তানি বাহিনী এখানে ৩০ মার্চ বোমা হামলা করলে সম্প্রচারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

দ্বিতীয় পর্বঃ ত্রিপুরার আগরতলায় ৩ এপ্রিল থেকে নতুন করে প্রচারকাজ শুরু হয়। উদ্যোগক্তারা খাগড়াছড়ির রামগড় সীমান্ত দিয়ে আগরতলায় যান। এই কেন্দ্র থেকেই ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়।

তৃতীয় পর্বঃ মুজিবনগর। কেন্দ্র ছিল কলকাতার ৫৭/৮ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের দোতলা বাড়ি। এই কেন্দ্র থেকেই ব্যাপকভাবে প্রচারকাজ শুরু হয়। সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পান আবদুল মান্নান এম এন এ।বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অনুরোধে ভারত সরকার ৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মধ্যম তরঙ্গের একটি ট্রান্সমিটারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তাই নিয়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে কলকাতায় স্থাপিত হয় সেই বিখ্যাত প্রচারকেন্দ্র। বাংলাদেশ পায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক,সরকার পরিচালিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।

পরিচালনা পর্ষদঃ

প্রধান সংগঠক বেলাল মোহাম্মদ
সহকারী সংগঠক আবুল কাশেম সন্দ্বীপ।
অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান ছিলেন শামসুল হুদা চৌধুরী -উনার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক একটি বিখ্যাত গ্রন্থ হলো “একাত্তরের রণাঙ্গন ”
বার্তা বিভাগে ছিলেন কামাল লোহানী।
প্রকৌশল বিভাগে ছিলেন সৈয়দ আবদুশ শাকের
প্রশাসন বিভাগে ছিলেন অনিল কুমার মিত্র।

বিখ্যাত অনুষ্ঠানমালাঃ

★ বাংলা ও ইংরেজিতে খবর ছাড়াও রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ বিভিন্ন মন্ত্রীর ভাষণ সম্প্রচারিত হতো।

★ নিয়মিত থাকত “চরমপত্র”। অত্যন্ত জনপ্রিয় এই বিদ্রুপাত্মক কথিকা লিখতেন ও পড়তেন এম আর আখতার মুকুল৷ অনুষ্ঠানটি পরিকল্পনা করেছিলেন আবদুল মান্নান এম এন এ। নামকরণ করেছিলেন আশফাকুর রহমান খান। ২৫ মে থেকে শুরু হয়ে এটি চলে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

★ কল্যাণ মিত্রের রচনা আর রাজু আহমেদের অভিনয়ে খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ” জল্লাদের দরবার ” নাটিকা।

★ এ ছাড়া “বঙ্গবন্ধুর বাণী”, মুক্তিবাহিনীকে নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান ” অগ্নিশিখা “, ” রক্তস্বাক্ষর”, “পিণ্ডির প্রলাপ”, ” রাজনৈতিক মঞ্চ “, ” রণাঙ্গনের চিঠি “, ” কাঠগড়ার আসামি “, ” মুক্তাঞ্চল ঘুরে এলাম “, ” সোনার বাংলা “, ” ইসলামের দৃষ্টিতে ” সহ অনেক অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হতো।

****** বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৫ মার্চ রাতের ইংরেজিতে দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণাটি বাংলায় অনুবাদ করে প্রথম অধিবেশনে সম্প্রচার করা হয়েছিল। সেটি অনুবাদ করেছিলেন চট্টগ্রামের চিকিৎসক সৈয়দ আনোয়ার আলীর স্ত্রী চিকিৎসক মঞ্জুলা আনোয়ার। এরপর তাঁরা সেই অনুবাদ সম্প্রচারের জন্য কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে নিয়ে যান। সে কারণে তাঁর স্ত্রী এই বেতার কেন্দ্রের প্রথম উদ্যোক্তা বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ****** (দৈনিক বাংলা, ২৬ মার্চ,১৯৮১)

★বেতারের অনুষ্ঠান শুরু হতো:

“জয় বাংলা, বাংলার জয়। জয় বাংলা, বাংলার জয়। হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়। কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধ রাতে। নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়। ” গানের সুর দিয়ে। গানটির গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার আর সুরকার আনোয়ার পারভেজ। আনোয়ার পারভেজ ২০০৬ সালে পরলোকগমন করেন। গাজী মাজহারুল আনোয়ার এখনো জীবিত আছেন। আনোয়ার পারভেজ ছিলেন ফকরুল আলম পরিচালিত ছয়দফা ভিত্তিক সিনেমা “জয় বাংলা ” র (১৯৭০)সংগীত পরিচালক। গাজী মাজহারুল আনোয়ার সিনেমাটার জন্য কিছু গান রচনা করেন। তন্মধ্যে এই গানটি কালজয়ী হয়েছে। এই গানটিকেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণসংগীত হিসেবে বিবেচনা করা হয়৷

★ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সর্বশেষ গান ছিল শহীদুল ইসলামের লেখা, সুজেয় শ্যামের সুর করা একটি বিজয়ের গান, “বিজয় নিশান উড়ছে ওই বাংলার ঘরে ঘরে৷ ” এটি ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে গণশিল্পী ও শব্দসৈনিক অজিত রায়ের নেতৃত্বে কোরাসে পরিবেশন করা হয়েছিল।

★ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে জড়িত ছিলেন বিখ্যাত সব মানুষ। সুজেয় শ্যাম,সমর দাস,মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, রথীন্দ্রনাথ রায়,অনুপ ভট্টাচার্য, আপেল মাহমুদ, কল্যাণী ঘোষ,রফিকুল আলমসহ আরও অনেকে।

★ বেশ কয়েকজন শব্দসৈনিকের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন –

১.জালালউদ্দিন আহমদ
২.সুব্রত বড়ুয়া
৩.আলী যাকের

৪.পারভিন হোসেন
৫.সৈয়দ হাসান ইমাম
৬.আলী রেজা চৌধুরী
৭.বাবুল আখতার প্রমুখ

★ বিজয়ের মুহূর্তে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে যে বিশেষ বিজয় বুলেটিন প্রচারিত হয় তার লেখক ও পাঠক ছিলেন কামাল লোহানী।

আরও পড়ুন

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছাড়া আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।