মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কিছু ক্রিটিকাল প্রশ্ন

21
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন সময় করা উদ্ধৃতিসমূহবাংলাদেশ বিষয়াবলী
Content Protection by DMCA.com

বিসিএস লিখিত + ভাইভা প্রস্তুতি
বাংলাদেশ বিষয়াবলী
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কিছু ক্রিটিকাল প্রশ্ন
২৪ জানুয়ারি গন অভ্যুত্থান দিবস বলা হয় কেন?
‘মুক্তিযুদ্ধ’ কাকে বলে?
আমাদের যুদ্ধটি ‘মুক্তিযুদ্ধ’ কেন?
আমাদের যুদ্ধটি কি ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ’ নয়?

১. ২৪ জানুয়ারি গন অভ্যুত্থান দিবস বলা হয় কেন?

১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা মামলায় ফাসি দেয়ার ষড়যন্ত্র, ছাত্রসমাজের ১১ দফা দাবি আন্দোলন, পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের কারনে গোটা দেশে আগুনের ফুলকি হয়ে জলতে থাকে মানুষের বিক্ষোভ। মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হতে থাকে রাজপথ।

আওয়ামীলীগ সহ ৮ টি রাজনৈতিক দল Democratic Action Committee (DAC) গঠন করে। ১৯৬৮ সালের গোটা ডিসেম্বর রাজনৈতিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক ও সাংবাদিকদের সরকার বিরোধী সভা শোভাযাত্রা চলতে থাকে, পাশাপাশি চলতে থাকে আন্দোলনকারী দের উপর পুলিশি নির্যাতন, ৭ ও ১৩ ডি. হরতাল পালিত হয়।

হরতালে ৪ জন মারা যায় ৩০ জন আহত ও ৩ শতাধিক গ্রেপ্তার হয়।৪ জানু. ১১ দফা দাবি, ৮ জানুয়ারি DAC এর আন্দোলন আরো ব্যাপকভিত্তিক আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৮ জানুয়ারি হরতালে পুলিশ ও ইপিআর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলাতে ঢুকে হামলে ও লুঠতরাজ চালায়, এর প্রতিবাদে ২০ জানুআরি আন্দোলনে ছাত্রনেতা আসাদ শহীদ হয়। ধীরে ধীরে এ গণবিক্ষোভ গন আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।

২৪ জানুআরি দেশের আপামর জনতা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে রাস্তায় নেমে আসে। গোটা দেশব্যাপী মানুষের ঢল প্লাবিত করে ফেলে রাজপথ, গন জাগরনের উত্তুঙ্গ জোয়ার সৃষ্টি হয়, শুধু ঢাকা নয়, খুলনা, রাজশাহী, সহ সারা দেশে গন আন্দোলন গন অভ্যুত্থানে রুপ নেয়।

ঐদিন সারা দেশে ৬ জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়। মূলত সমাজের সকল শ্রেনীর মানুষ, ও সংগঠন এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে এবং ২৪ জানুয়ারি তা গন অভ্যুত্থানে রুপ নেয়। এজন্য ২৪ জানু কে গন অভ্যুত্থান দিবস বলা হয়।

২. ‘মুক্তিযুদ্ধ’ কাকে বলে? আমাদের এটা মুক্তিযুদ্ধ বলা হয় কেন?

উইকিপিডিয়াতে দেয়া সংজ্ঞা থেকে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে প্রাথমিকভাবে একটি জাতি বা গোষ্ঠীর মুক্তি বা স্বাধীনতা লাভের জন্য লড়াই। এই লড়াই একটি ঔপনিবেশিক শক্তিকে উৎখাত করার জন্য হতে পারে অথবা কোন স্বৈরশাসক বা একনায়ককে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের জন্য হতে পারে।

এই যুদ্ধ দুটি বাহিনীর মধ্যকার নিয়মিত বা সাধারণ যুদ্ধের ন্যায় না, এর বিস্তৃতি ব্যাপক। মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞার জন্য ইংরেজী ও বাংলা অভিধান ঘাঁটলে আরো স্বল্প পরিসরে মোটামুটি এমন সংজ্ঞাই পাওয়া যায়। এই সংজ্ঞাগুলোর মধ্যে ‘মুক্তি’ নামক একটি সাধারণ অনুমিতি আছে। বস্তুতঃ এই ‘মুক্তি’ ব্যাপারটি পরিষ্কার হলে তার জন্য যুদ্ধের ব্যাপারটিও পরিষ্কার হয়।

আমাকে কেউ ঘরের মধ্যে আটকে বা হাত-পা বেঁধে রাখলো; তারপর অন্য কেউ এসে আমাকে আটক অবস্থা থেকে ছাড়িয়ে আনলো। এভাবে আমি বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেলাম। আমরা ১৯০ বছর বৃটিশদের অধীনে ছিলাম তারপর দীর্ঘ বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে ১৯৪৭ সালের অগাস্টে বৃটিশ শাসনের অবসান হলে আমরা পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেলাম।

পতিত স্বৈরাচার এরশাদের সামরিক সরকার ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ থেকে দেশের ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল; তারপর ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর গণআন্দোলনের মাধ্যমে তার পতন হয়। এভাবে আমরা স্বৈরাচার থেকে মুক্তি পেলাম। মুক্তি পাবার এমন হাজারো উদাহরণ দেয়া যায় যা কখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক, কখনো গোষ্ঠীকেন্দ্রিক আবার কখনো জাতিকেন্দ্রিক।

বৃহত্তর পরিসরে শোষণ-বঞ্চনা-অবিচার-অসাম্য, অন্যায়-অমানবিক আচরণ, কাঙ্খিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চা সীমাবদ্ধকরণ, নৃতাত্ত্বিক-ধর্মীয়-ভাষা-জাতি-গোষ্ঠীগত বিচারে দলন-নিষ্পেষণ, চিন্তা-ভাষার স্বাধীন বিকাশের ও চর্চার পথরুদ্ধকরণ, সাধারণকে মানবিক-নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিতকরণ ইত্যাদি অন্যায় থেকে মুক্তি লাভের নিমিত্তে স্বতঃস্ফুর্ত, ব্যাপক ও সার্বিক যুদ্ধই মুক্তিযুদ্ধ।

স্থান-কাল ভেদে এখানে উল্লেখিত নিয়ামকগুলোর এক বা একাধিক নিয়ামক অনুপস্থিত থাকতে পারে অথবা স্থানীয় কোনো নিয়ামক যুক্ত হতে পারে, কিন্তু তাতে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়না।

৩. আমাদের যুদ্ধটি ‘মুক্তিযুদ্ধ’ কেন?

১৯৭১ সালে যে যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল তা একই সাথে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে এবং তাদের সহযোগী বাঙালীদের বিরুদ্ধে।

পূর্ব বাংলার মানুষের উপর পাকিস্তানীদের দুই যুগের অর্থনৈতিক শোষণ, সামাজিক-রাজনৈতিক বঞ্চনা, অবিচার, প্রতি ক্ষেত্রে অসাম্য, নিয়মিতভাবে অন্যায়-অমানবিক আচরণ, বাঙালী সামাজিকতা ও সংস্কৃতির স্বাধীন চর্চার পথ রুদ্ধকরণ, বাঙালী নৃতাত্ত্বিক পরিচয় বা অমুসলিম ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় সাধারণের সাথে অন্যায় ও অমানবিক আচরণ করা, মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথরুদ্ধকরণ, বাঙালীদের প্রাপ্য মানবিক-নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিতকরণ আমাদেরকে পাকিস্তানী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের সাথে একটি অবশ্যম্ভাবী সাংঘর্ষিক অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়।

১৯৭১ সালের মার্চের শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই দুই পক্ষের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, কোথাও কোথাও পাকিস্তানীদের পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ এই সংঘর্ষের সূচনা করে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনী এদেশের মানুষের উপর সশস্ত্র আক্রমণ ও গণহত্যা শুরু করলে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

খুব স্বল্প সংখ্যক লোক ছাড়া পূর্ব বাংলার সকল জনগণ স্বতঃস্ফুর্তভাবে, পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সার্বিক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমাদের তরফ থেকে যুদ্ধটি উপরে আলোচিত মুক্তিযুদ্ধের সবগুলো শর্ত পালন করে বলেই সেটি ‘মুক্তিযুদ্ধ’।

৪. আমাদের যুদ্ধটি কি ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ’ নয়?

একথা সত্য যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি এবং কোনো কারণে মুক্তিযুদ্ধে আমরা পরাজিত হলে আমাদেরকে পরাধীন জাতির পরিনতি বহন করতে হতো, কিন্তু তারপরও আমাদের যুদ্ধটি নিছক স্বাধীনতার যুদ্ধ নয় – এটি মুক্তিযুদ্ধ।

উত্তর আমেরিকায় ১৭৭৫ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ও তার তেরোটি উপনিবেশের মধ্যকার যুদ্ধটি স্বাধীনতার যুদ্ধ। কারণ, মুক্তিযুদ্ধ হবার আবশ্যকীয় উপাদানগুলোর অনেকগুলোই সেখানে অনুপস্থিত। সেই যুদ্ধটি উত্তর আমেরিকার মাটি থেকে বৃটিশ শক্তিকে উৎখাতের উদ্দেশ্যে হলেও তা যুক্তরাজ্য রাষ্ট্রটি বা সেই রাষ্ট্রের চেতনার বিপক্ষে নয়।

পক্ষান্তরে আমাদের যুদ্ধটি পাকিস্তান রাষ্ট্রটির ধারণা বা তার মূলসূত্র দ্বিজাতি তত্ত্বের বিপক্ষে, ধর্মীয় রাষ্ট্র গঠনের বিপক্ষে, প্রকৃত জাতিগত পরিচয় মুছে দিয়ে কাল্পনিক জাতিপরিচয় সৃষ্টির বিপক্ষে এবং একটি রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে জাতিগত শোষণের বিপক্ষে।

এখানে পরিণামে পাকিস্তানীদের উৎখাত করে আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম করা হলেও যুদ্ধটির মাত্রা কেবলমাত্র স্বাধীনতার যুদ্ধের চেয়ে গভীর মাত্রার। তাই আমাদের যুদ্ধটিকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ না বলে ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ’ বললে তার পরিসরটিকে খাটো করা হয়।

বর্তমানে যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ’ হিসাবে চালাতে চায় তারা এভাবে মুক্তিযুদ্ধকে শুধু খাটোই করতে চায়না বরং তার পিছনে আরো অসৎ উদ্দেশ্য ধারণ করে। মুক্তিযুদ্ধকে স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে দ্বিজাতি তত্ত্বকে অস্বীকার করা, ধর্মীয় রাষ্ট্র গঠনের বিরোধীতা করা, কাল্পনিক জাতি সৃষ্টির অপচেষ্টা রোধ করা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে পাশ কাটানো যায়।

ফলে বাংলাদেশকে একটি “বাঙালী পাকিস্তান” বানানোর চেষ্টা করা যায়। ১৯৭৫ পরবর্তীকালে সেই চেষ্টা দেখা গেছে এবং তখন থেকেই ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বনাম ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ’ নামক প্রহেলিকাটি তৈরি করা হয়েছে।

লিখেছেনঃ আসিফ ইসলাম , ৩৬তম বিসিএস

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কিছু ক্রিটিকাল প্রশ্ন ছাড়া আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আপডেট পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল যোগ দিতে পারেন।