ভ্যাকসিন, কূটনীতি, অর্থনীতি ও বাংলাদেশ

ফোকাস রাইটিং FOCUS WRITING
Content Protection by DMCA.com

বিসিএস ও ব্যাংক প্রস্তুতি
ফোকাস রাইটিং
ভ্যাকসিন, কূটনীতি, অর্থনীতি ও বাংলাদেশ
ভ্যাকসিনের রাজনীতিঃ একটি ওয়াইপিএফ পর্যালোচনা

এপ্রিলের ২৫ তারিখ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসের টিকাদান ১০০ কোটি ডোজ ছাড়িয়ে গেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে টিকাদান কার্যক্রম শুরুর পাঁচ মাসের কম সময়ে এ লক্ষ্য অর্জন নিঃসন্দেহে আশাবাদী হওয়ার মতোই খবর।

কিন্তু একই সাথে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ খবর হল, এ টিকাদানের অর্ধেকের বেশি হয়েছে মাত্র চারটি দেশে। দেশ চারটি হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন ও ভারত; যারা হয়তো বিশ্বে ধনী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত কিংবা ভ্যাকসিন উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

ধনী-গরিবের বৈষম্য ছাড়াও ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও ভ্যাকসিন প্রাপ্তি ও সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। এটা এখন প্রমাণিত যে, করোনাভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে আনার সবচেয়ে কার্যকরী কৌশল হচ্ছে ভ্যাকসিন। আর তাই করোনাভাইরাসে দৈনিক হাজারো মানুষ মৃত্যুবরণ করলেও, ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্বরাজনীতি দিন দিন আরও জমে উঠছে। বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের অন্যতম অস্ত্রের নাম ভ্যাকসিন বা টিকা।

মোটা দাগে চারটি দেশ এখন করোনার ভ্যাকসিনের রাজনীতিতে খুবই সক্রিয়: চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ভারত। এ দেশগুলো কোভিডের ভ্যাকসিনকে তাদের কূটনীতির হাতিয়ারে পরিণত করেছে। ব্যাপারটা অনেকটা এমন হয়ে গেছে যে কে ভ্যাকসিন পাবে, কে পাবে না- তা নির্ভর করছে এই দেশগুলোর সাথে কার কেমন সম্পর্ক তার উপর।

এদিকে করোনার প্রকোপ সামলে উঠতে না পেরে, কোনো কোনো দেশ ভ্যাকসিন রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর ফলে আজ জাতীয়তাবাদের ফাঁদে ভ্যাকসিন বিশ্বায়ন। ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের উত্থানে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন বিপন্ন হবে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা সত্য হতে চলেছে।

প্রারম্ভিকা:

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শুরুতে মানবিক পৃথিবী কিংবা জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বের যে আশাবাদ সামনে এসেছিল- দিন দিন তা ফিকে হয়ে আসছে। ২০১৯ সালের শেষ প্রান্তে বিস্তার শুরু হওয়া করোনাভাইরাস পুরো পৃথিবীকেই আজ নতুন বাস্তবতার সামনে নিয়ে এসেছে। করোনা মহামারি এখন বিশ্ব রাজনীতির নতুন উপাদানে পরিণত হয়েছে।

গত কিছুদিন ধরে যারা কোভিড সংক্রান্ত খবরের দিকে নজর রাখেন, তাদের কাছে কিছু শব্দ হয়তো বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। যেমনঃ ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ, ভ্যাকসিন কূটনীতি , ভ্যাকসিন সাম্রাজ্যবাদ। অন্য একটি দেশের ওপর নিজের প্রভাব বিস্তার করে তাকে অনুগত বা নতজানু রাখার প্রচেষ্টা যুগে যুগে কালে কালে চলে এসেছে। কখনো তা শক্তি প্রয়োগ করে, কখনো আর্থিক ভাবে, কখনো বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভাবে।

একেক সময় একেক অস্ত্র বা উপকরণ এই কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের অন্যতম অস্ত্রের নাম করোনা ভ্যাকসিন বা টিকা। পৃথিবী জুড়ে করোনা ভাইরাসজনিত রোগের বিস্তার জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও অসহায়ত্বের সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিতে এখন ভ্যাকসিন হয়ে উঠেছে কাউকে নিয়ন্ত্রণ, বশে রাখা, সম্পর্ক উন্নয়ন এবং শিক্ষা দেয়ার অন্যতম উপকরণ।

আভিধানিক অর্থে এক রাষ্ট্রের সাথে আরেক রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ভ্যাকসিনের ব্যবহার হলো ভ্যাকসিন কূটনীতি৷ উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড ভ্যাকসিনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রতি চীন ও ভারতের বিশেষ আগ্রহের কথা তুলে ধরতে পারি৷ ব্যাপক অর্থে ভ্যাকসিন কূটনীতি বলতে শুধু অর্থায়নকে বুঝায় না, বরং ভ্যাকসিনের আবিষ্কার, কেনা-বেচা, সরবরাহের জন্য কৌশলগত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বিনিময় এই কূটনীতির অন্তর্ভুক্ত।

যে সমস্ত দেশ বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল, সেই সব দেশ ভ্যাকসিনকে তাদের কূটনীতির হাতিয়ারে পরিণত করেছে। অন্যদিকে যারা আগে ক্ষমতাশালী ছিল তারা তাদের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে ‘ভ্যাকসিন কূটনীতি’ একটি প্রমাণিত শক্তি হলেও ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’-এর কাছে তা অনেকবারই পরাস্ত হয়েছে৷ ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের বৈশিষ্ট্য পরিষ্কার। প্রথমত, নিজের দেশের জন্য ভ্যাকসিন মজুত করা।

এরপর কে ভ্যাকসিন পাবে, কোত্থেকে পাবে সেটাই ঠিক করে দেবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো। ধনী এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলো যতটা পেরেছে এই জাতীয়তাবাদের অনুসরণ করেছে। ভ্যাকসিন বৈষম্যের ফলে ধনী দেশের হাতে জমে উঠেছে ভ্যাকসিন কিন্তু গরিব দেশগুলোতে মানুষ ভ্যাকসিন পাচ্ছে না। জাতিসংঘ তহবিলের (ইউএনএইডস) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যেখানে ধনী দেশগুলোয় প্রতি সেকেন্ডে একজন মানুষ করোনার ভ্যাকসিন পাচ্ছে, সেখানে অসংখ্য দরিদ্র দেশে এখনো কোনো ভ্যাকসিনই পৌঁছেনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে উৎপাদিত মোট টিকার ৮৭ শতাংশ চলে গেছে উন্নত দেশগুলোয় আর নিম্ন আয়ের দেশগুলো পেয়েছে ০.২ শতাংশ। এরই মধ্যে উন্নত দেশগুলোয় গড়ে প্রতি চারজনে একজন করোনার ভ্যাকসিন পেলেও নিম্ন আয়ের দেশে এ হার প্রতি ৫০০ জনে একজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে এবং জানিয়েছে এই জাতীয়তাবাদের ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সবগুলো সময়মতো ভ্যাকসিন পাবে না।

আর যদি বিশ্বের সকল দেশ পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন না পায়, তবে পুরোপুরিভাবে কোভিড নির্মূলও সম্ভব হবে না। এদিকে ইউরোপের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রেন্ডের বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন পাওয়া না গেলে আগামী এক বছরে বিশ্ব অর্থনীতির জিডিপিতে কোভিড-১৯ এর প্রভাব হবে তিন দশমিক চার ট্রিলিয়ন ডলার৷ আর ভ্যাকসিন পাওয়া গেলে পরিমাণ দাঁড়াবে এক দশমিক দুই ট্রিলিয়নে ৷

করোনার আঘাতের আগপর্যন্ত বিশ্বে মহামারি মোকাবিলায় একধরনের স্বাস্থ্য কূটনীতি ছিল। ওই কূটনীতিতে নিজের রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক, মানবাধিকার ও সবার জন্য মানবিক সাহায্যের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। করোনার সংকটে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টি তেমন প্রতিফলিত হচ্ছে না। ফলস্বরূপ ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ, ভ্যাকসিন কূটনীতি ও ভ্যাকসিন সাম্রাজ্যবাদের তীব্র টানাপোড়েনে বিপাকে ভ্যাকসিনের বিশ্বায়ন ও বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য।

ভ্যাকসিন রাজনীতির ক্ষেত্রে পরাশক্তির ভূমিকা :

করোনা মহামারির শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং নোবেল বিজয়ী অনেক বিশ্ব বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদ, লেখক, কবি একটি দাবি করেছিলেন যে করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে যেন খুব খারাপ কিছু (রাজনীতি) না হয়। সার্বজনীন মানবতার খাতিরে কোভ্যাক্স-এর মাধমে যেন করোনার ভ্যাকসিনকে সহজলভ্য করা হয়।

বিশ্বের গরিব দেশগুলো যেন সহজে ভ্যাকসিন পেতে পারে। এতে অনেক উন্নত দেশ রাজি হলেও ভ্যাকসিন যখন উৎপাদন শুরু হলো তখন বিশ্বনেতাদের আবেদনের প্রতিফলন দেখা গেল না বরং ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সংহত করার জন্য ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ব মোড়লেরা ভ্যাকসিনকে ব্যবহার করছে।

ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে ও সরবরাহে নেতৃত্ব দিচ্ছে প্রভাবশালী উন্নত দেশগুলো। ভ্যাকসিন তৈরিতে এগিয়ে থাকা তিনটি বড় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ফাইজার-বায়োএনটেক, মডার্না ও অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা। সবগুলোই যুক্তরাষ্ট্রের এবং যুক্তরাজ্যের ভ্যাকসিন। চীন তৈরি করেছে সিনোভ্যাক, ক্যানসিনো ও সিনোফার্ম নামের ভ্যাকসিন। রাশিয়া তৈরি করেছে স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিন। কোনো টিকা তৈরি না করেও ভারত ভ্যাকসিনের রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে।

অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে ভারতের পুনে সিরাম ইনস্টিটিউট।করোনার টিকা নিয়ে বিশ্ব এখন মোটামুটি দুইভাবে বিভক্ত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ওষুধ কোম্পানি। অপর দিকে চীন ও রাশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো। চাহিদার তুলনায় সীমিত পরিমাণে ভ্যাকসিন উৎপাদন ও ধনী দেশগুলোর প্রয়োজনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ভ্যাকসিন মজুদের ফলে বিশ্বে বর্তমানে ভ্যাকসিনের তুমুল সংকট দেখা দিয়েছে।

ভ্যাকসিন পাওয়ার প্রতিযোগিতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা তিক্ততার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চুক্তি অনুসারে সরবরাহ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিরুদ্ধে মামলার হুমকি দিচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন।

পেটেন্টের কারণেও চাইলেই টিকার উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। এ নিয়েও আছে রাজনীতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্যভুক্ত ১৯৪টি দেশে অন্তত ১৫০০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিনের প্রয়োজন হবে। অর্থমূল্যে যা আনুমানিক দশ লাখ কোটি টাকার ব্যবসা। এই কথা মাথায় রেখে ওষুধ কোম্পানিগুলো টিকার সূত্র কিনে রেখেছে।

সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এদের বাইরে কেউ ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে পারছে না। তবে পেটেন্ট ও মেধাস্বত্বে ছাড় দেওয়ার প্রসঙ্গ ওঠার পর থেকে এর বিরোধিতাও জোরালো হয়ে উঠেছে। ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ওই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। মেধাস্বত্ত্ব শিথিল হওয়ার পর ভ্যাকসিন উৎপাদন প্রযুক্তি রাশিয়া ও চীনের দখলে চলে যেতে পারে বলে এমনিতেই উদ্বেগে রয়েছে পশ্চিমা বিশ্বে।

উদ্ভূত পরিস্থিতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া এবং চীন নিজেদের অনুকূলে থাকা পররাষ্ট্রনীতির বিনিময়ে বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন সরবরাহ ও উৎপাদনের অনুমতি প্রদান করেছে। কেবল পররাষ্ট্র নীতিমালা নিয়ে আপসের মাধ্যমে নয়, বরং টিকার বদলে তারা নিজেদের অনুকূলে ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনেও মনোযোগ দিয়েছে।

যদি চীন-রাশিয়ার ভ্যাকসিন সত্যিই কার্যকর হয় এবং তাদের ভ্যাকসিন সম্পর্ক বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সঙ্গে শর্ত সাপেক্ষে বা বিনা শর্তেও স্থাপিত হয় এবং মানুষের প্রাণরক্ষা হয় তবে রাশিয়া-চীন বিশ্ব-রাজনীতিতে এক ধরনের নতুন মেরুকরণ তৈরি করবে।

এবার আসুন দেখে নেয়া যাক ,করোনার ভ্যাকসিনের রাজনীতিতে সবচেয়ে সক্রিয় চারটি দেশ চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ভারত এর মধ্যে কার ভ্যাকসিন রাজনীতি ও কূটনীতির হালচাল কেমন।

যুক্তরাষ্ট্র:

যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যাকসিন রাজনীতিতে ভ্যাকসিন কূটনীতির চেয়ে ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে বলা যায়। যুক্তরাষ্ট্র এক কথায় ভ্যাকসিন মজুদ করছে। ভ্যাকসিন সরবরাহের শুরু থেকেই, বিশ্বের অনুন্নত ও মহামারীতে বিপর্যস্ত দেশগুলোতে ভ্যাকসিন পাঠানোর লক্ষ্যে বৈশ্বিক উদ্যোগে গঠিত গ্যাভি-কোভেক্স জোটে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

ট্রাম্পের ‘আগে আমরা, পরে অন্যরা’ ধারনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ভ্যাকসিন বাজারে আসার আগেই ধনী দেশগুলো প্রি অর্ডারের মাধ্যমে কোটি কোটি ডোজের প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে৷ প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতায় এসে কোভেক্স জোটে যোগ দিলেও সবার আগে মার্কিন নাগরিকদের ভ্যাকসিন নিশ্চিত করার স্বার্থে বহির্বিশ্বে ভ্যাকসিন সরবরাহের ক্ষেত্রে তেমন সক্রিয় ভূমিকা পালন করেননি।

এমনকি মার্চ মাস পর্যন্ত যেখানে বিশ্বের প্রায় ১৩০টি দেশে একটি ভ্যাকসিনও পৌছায়নি সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যে এর জনসংখ্যার প্রয়োজনের প্রায় তিন গুণেরও অধিক ভ্যাকসিন মজুদ ছিল। সীমান্তবর্তী দেশ মেক্সিকো আর কানাডায় বিলম্বে সামান্য সহযোগিতা ছাড়া বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্যে হাত গুটিয়ে বসে থাকার অভিযোগ রয়েছে দেশটির বিরুদ্ধে।

এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের চাহিদা মেটাতে টিকায় ব্যবহূত কাঁচামাল রপ্তানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ভ্যাকসিন উৎপাদন ও রপ্তানিতে হিমশিম খেতে হয় ভারতকে। তবে সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে , জো বাইডেন প্রশাসন বিশ্বের ১০০ টি দেশে ৫০ কোটি ডোজ ফাইজার ভ্যাকসিন উপহার দিবে। যার মধ্যে ২০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন চলতি বছরেই দেয়া হবে।

ভারত:

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন বাজারে আসার আগে থেকেই দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভারত কেন্দ্রিক প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। দেশগুলো অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের ওপরই নির্ভর করেছিল। এর কারণ হচ্ছে, এসব দেশে সুলভে সরবরাহের শর্তে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন উৎপাদনের অনুমতি নিয়েছিল ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট।

এর বাইরেও এ দেশগুলোর ভ্যাকসিনপ্রাপ্তি নিশ্চিতে গঠিত কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটিতেও ভ্যাকসিন সরবরাহের কথা ছিল ভারতের। ভারত এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার টিকার বাজারের একচেটিয়াকরণ করে। ভারত যে ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’ সূচনা করেছিল–এই অঞ্চলে এবং অন্যত্র –তার উদ্দেশ্য মহানুভবতা নয়। তার উদ্দেশ্য সহজ। একই বিবেচনায় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ভারত চার জাতির সমন্বয়ে গঠিত কোয়াডে––ভ্যাকসিনবিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

ভারতের এই কূটনীতির লক্ষ্য চীনকে প্রভাব বিস্তার করতে না দেওয়া। তারা চীনের ভ্যাকসিনগুলোকে আঞ্চলিক বাজার থেকে সরিয়ে দিতে কোন কিছুই বাদ রাখে নি। এক পাকিস্তান বাদে সার্কভুক্ত প্রতিটি দেশকেই তারা বিপুল পরিমাণ ভ্যাকসিন উপহার দেয়। এমনকি চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এমন কিছু দেশকেও তারা উপহার হিসেবে বিপুল পরিমাণ ভ্যাকসিন পাঠায়। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে তারা সবচেয়ে বেশি ৩৩ লাখ ভ্যাকসিন উপহার দেয়। ভারত নিজ দেশে ব্যাপক সংখ্যক করোনা রোগী থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার, শ্রীলংকা এবং আফগানিস্তানকে ভ্যাকসিন দেয়ার আগাম প্রতিশ্রুতি দেয়।

তবে সম্প্রতি দেশটিতে ভাইরাসের সংক্রমণ বহুগুণ বেড়ে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, সেরাম ইনস্টিটিউট ভারতের স্থানীয় চাহিদা পূরণেই হিমশিম খাচ্ছে। ফলে ভারত ভ্যাকসিন রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।বিশ্বের জন্য সেরামের ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে স্বল্প ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের অন্তত ৯২টি দেশ।

ভারত প্রায় ৭০ লাখ ভ্যাকসিন রপ্তানি করে যা বর্তমান পরিস্থিতির বিবেচনায় এর এক মাসের ভ্যাকসিন উৎপাদন ক্ষমতার সমান। অথচ ভারতের এখন দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ ভ্যাকসিন দরকার। একসময়ে বিশ্বের সর্বাধিক ভ্যাকসিন উৎপাদক রাষ্ট্র ভারত আজ ভ্যাকসিন আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে। ভারতের ভ্যাকসিন রাজনীতির ক্ষেত্রে তাই ভ্যাকসিন কূটনীতি হেরে গেছে ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের কাছে।

চীন:

ভ্যাকসিন রাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে চীন বেশ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছে। চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারাই উহানে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে। যা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে চীন ভ্যাকসিন দিয়ে সারা পৃথিবীতেই নিজের অবস্থান দৃঢ় করার উদ্যোগ নেয়। আঞ্চলিকভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহে ভারতের ব্যর্থতা ও উন্নত দেশগুলোর স্বার্থপরতার সুযোগ নিয়ে চীন ঘোষণা করেছে যে, তাদের সিনোভ্যাক এবং সিনোফার্ম ভ্যাকসিন দুটো ‘বৈশ্বিক জনসাধারণের সম্পদ’।

চীন দ্রুত সময়ের মধ্যে ১০০ টি দেশে ভ্যাকসিন পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। মার্চ মাস পর্যন্ত নিজ দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি চীন প্রায় ১২ কোটি ভ্যাকসিন রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রপ্তানি করেছে এর অর্ধেকেরও কম। চীন চলতি বছরের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি ডোজ ও আগামী বছরের মধ্যে ৫০০ কোটি ভ্যাকসিন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, এপ্রিলের ৫ তারিখ পর্যন্ত চীন বিশ্বের ৮০টি দেশে ভ্যাকসিন উপহার দিয়েছে এবং ৪০টি দেশে ভ্যাকসিন রপ্তানি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন কোভিড ভ্যাকসিনকে একদিকে তাদের ইমেজ পুনরুদ্ধার, অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের বলয় বিস্তারের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে৷ এপ্রিল এর শুরুর দিক পর্যন্ত যে কয়টি রাষ্ট্রে চীন ভ্যাকসিন উপহার দেয় এর মধ্যে ২টি বাদে সকলেই চীনের “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” নামক প্রকল্পের সদস্য।

বাইডেন যখন প্রতিবেশী মেক্সিকোকে ভ্যাকসিন দিতে গড়িমসি করছেন, চীন সেই সুযোগে মেক্সিকোতে ২ কোটি ভ্যাকসিন রপ্তানির চুক্তি স্বাক্ষর করে। ভ্যাকসিন নিয়ে চীনের দৌড়ঝাঁপ, এর সুদূরপ্রসারী কূটনীতিরই অংশ। চীন ভ্যাকসিন কূটনীতির মাধ্যমে এর বিরোধপূর্ণ অঞ্চল ও সমালোচিত কর্মকাণ্ডে বৈশ্বিক সমর্থন জোরদার করতে চায়। পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশের বাণিজ্যের পথও সুগম করতে চায়। যেমন টিকার চালানের পূর্বশর্ত হিসেবে ব্রাজিলের উপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশটির ফাইভ-জির বাজার হুয়াওয়ের জন্য উন্মুক্ত করেছে চীন।

এমনকি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই তারা ফিলিস্তিন ও ভেনেজুয়েলাতে লক্ষাধিক ভ্যাকসিন উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে। সম্প্রতি চীনের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশের (বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, নেপাল, পাকিস্তান, এবং আফগানিস্তান) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একটি ভার্চুয়াল মিটিং করেছে এবং চীনের নেতৃত্বাধীন ‘কোভিড -১৯ পরামর্শ, সহযোগিতা এবং মহামারি-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য চীন-দক্ষিণ এশিয়া প্ল্যাটফর্ম’ এ যোগ দিয়ে চীনের কাছ থেকে ভ্যাকসিন প্রত্যাশা করেছে।

এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারে ভারতের থেকে চীন এক ধাপ এগিয়ে গেল। খোদ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য রাষ্ট্র হাঙ্গেরিতেও চীনা ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হচ্ছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী নিজে চীনা ভ্যাকসিন নেন এবং পশ্চিমা ভ্যাকসিনের চেয়ে চীনা ভ্যাকসিনের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করেন যা চীনের ভ্যাকসিন কূটনীতির জন্য এক বিরাট সাফল্য।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এখন চীনা ভ্যাকসিনই একমাত্র ভরসা। ধনীদের ভ্যাকসিন অলীক স্বপ্ন মনে করে অনেক দেশই এখন চীনের দিকে ঝুঁকছে ৷ “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” প্রকল্পের অংশ হিসেবে দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা হলো চীনের ভ্যাকসিন পরিকল্পনার বড় এলাকা। যেসব দেশে চীনের বিনিয়োগ আছে, তাদের অগ্রাধিকােরর ভিত্তিতে টিকার সুবিধা দিচ্ছে চীন। এতে করে অন্য অনেক রাষ্ট্রও চীনের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।

কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন ব্যবহার করে চীন এভাবে আরও কিছু দেশের বাজার দখল করতে পারে ও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে এক নতুন সাম্রাজ্যবাদী বলয় সৃষ্টি করার পথ সুগম করে তুলতে পারে। যদি তা-ই হয়, তবে তা হবে পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়। চীনা ভ্যাকসিনের বিশ্বায়নে তখন ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে কিছুটা হলেও পালাবদল আসবে।

রাশিয়া:

এক সময় স্পুটনিক নভোযান আকাশে পাঠিয়ে মহাকাশ জয় করেছিল রাশিয়া। এখন স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিন দিয়ে তারা বিশ্ব জয় করতে চায়। তবে চীনের মত বৃহৎ আকারে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন সাহায্য প্রদান রাশিয়ার ভ্যাকসিন রাজনীতি ও কূটনীতির মূল ভিত্তি নয়। অর্থনৈতিক ও উৎপাদন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে গ্যাভি-কোভেক্স জোটে যোগ না দিয়ে রাশিয়া ভ্যাকসিন বিতরণের জন্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পথ বেছে নিয়েছে।

অ্যালেক্সি নাভালনি ও ইউক্রেন ইস্যুতে দা-কুমড়ো সম্পর্ক বিরাজ করলেও স্পুটনিক ভি এর প্রতি ফ্রান্স ও জার্মানির প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেতাদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া রাশিয়ার ভ্যাকসিন কূটনীতির জন্য সাফল্য হিসেবে ধরে নেয়া যায়। বলকান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে ভ্যাকসিন সরবরাহে গাফিলতির সুযোগ নিয়ে মধ্য এবং পূর্ব ইউরোপিয়ান দেশগুলোকে নিজেদের ভূ-রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্যে রাশিয়া ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছে।

বাংলাদেশ, ভারত, আরব আমিরাত, ব্রাজিল, আর্জেনটিনা, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়াসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কাছে স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিন হয়ে উঠছে খুবই কাঙ্খিত বস্তু। অপরদিকে রাশিয়াও তার মিত্র দেশগুলোতে ভ্যাকসিন রপ্তানি করতে আগ্রহী। মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৭০টি দেশে ভ্যাকসিন পাঠাতে সম্মত হয়েছে রুশ সরকার।

রাশিয়ার ভ্যাকসিনের চাহিদার প্রধান কারণ হচ্ছে এর কার্যকারিতা। ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা প্রায় ৯১ শতাংশ এবং মাঠ পর্যায়ে আরও বেশি যা অন্য যেকোনো ভ্যাকসিনকে ছাড়িয়ে গেছে। ভ্যাকসিন কূটনীতির সফল প্রয়োগ করে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া বিভিন্ন বিষয়ে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার ও আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভের পথ সুগম করে নিচ্ছে।

ভ্যাকসিন গিনিপিগ হিসেবে তৃতীয় বিশ্বের নিজস্ব কূটনীতি:

বাংলাদেশসহ অন্য দেশগুলো দ্রুততম সময়ে চীন বা রাশিয়ার কোন উৎস থেকে ভ্যাকসিন পাবে কি না, কিংবা ভারত সরকারকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি করাতে পারবে কি না, তার সবকিছুই নির্ভর করছে ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং বিবদমান পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনায় এই দেশগুলোর কূটনীতিকদের দক্ষতা ও বিচক্ষণতার ওপর।

ভারত থেকে নিকট ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত টিকার চালান পাওয়া নাও যেতে পারে, আবার সেরাম ইন্সটিটিউট থেকে ভ্যাকসিন না পাওয়া মানে কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি থেকেও ভ্যাকসিন না পাওয়ার ব্যাপারে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হওয়া।

এসব সমীকরণকে সামনে রেখে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ রাশিয়া ও চীনের করোনা টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এটিই ছিল সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল ও অনুন্নত তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহ, যাদের রাষ্ট্রযন্ত্র অনেকটাই উন্নত দেশগুলোর সাহায্য সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল, তাদের প্রায়ই ভূ-রাজনীতির বিচারে পরষ্পরবিরোধী প্রভাবশালী দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়।

ভ্যাকসিন কূটনীতির ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য। চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে ভ্যাকসিন সরবরাহ বিষয়ক চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র ও এর সহযোগী পরাশক্তিগুলো সুনজরে নাও দেখতে পারে। ফলে এক পক্ষের সাহায্য নেবার কারণে পরবর্তীতে অন্য পক্ষের রোষানলে পড়ে সমর্থন হারাবার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো চীন, রাশিয়া , যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্রের কাছে যেন ভ্যাকসিন গিনিপিগের মত। চীনা ভ্যাকসিন নিজ দেশেই চূড়ান্ত অনুমোদন পাবার আগেই আফ্রিকার অনেক দেশে সরবরাহ করে সাধারণ মানুষ এমনকি রাষ্ট্র প্রধানদের শরীরেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। রাশিয়া-চীন যে ভ্যাকসিন সরবরাহ করছে তাও করছে কূটনৈতিক বিবেচনায়। ভ্যাকসিন কূটনীতির মাধ্যমে তিব্বত, হংকং, তাইওয়ান, জিনজিয়াং ইস্যুতে মিশর, কিরগিজস্তান, প্যারাগুয়ে ও ক্যারিবিয়ান দেশগুলো অবস্থান পুনঃনির্ধারণের ক্ষেত্রে সফল হয়েছে চীন।ভ্যাকসিন কূটনীতির কল্যাণে সিরিয়া, রাশিয়ার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন আদায় করে নিতে সক্ষম হয়।

তুলনামূলক স্বল্পোন্নত বলকান ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো ইইউ থেকে সময়মত ভ্যাকসিন সরবরাহ ও সহযোগিতা না পাওয়ায় এখন চীন ও রাশিয়ার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের দিকে ঝুঁকছে। ভ্যাকসিন কূটনীতিতে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। ভারতের থেকে টিকা পাবার বিষয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হবার পর থেকেই বিকল্পের সন্ধানে বেরিয়েছে বাংলাদেশ। ২৫ এপ্রিল ঢাকার পত্রিকাগুলো খবর দিয়েছে, বাংলাদেশ এরই মধ্যে রাশিয়ার ভ্যাকসিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনের কথা ভাবছে।

সে-বিষয়ক একটি চুক্তিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এরই মধ্যে স্বাক্ষর করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করছেন, যেখানে দেশটির ভ্যাকসিন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চীন বাংলাদেশে উপহার হিসেবে ভ্যাকসিন পাঠিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, চীনের ভ্যাকসিন দ্রুতই আসছে। আগামীতে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে দেড় কোটি ভ্যাকসিন কিনবে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন।

কিছু দেশে সরকারি ভাবেই ভ্যাকসিন গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ইরিত্রিয়া, মাদাগাস্কার, বুরুন্ডি-সহ আরো কিছু দেশ ভ্যাকসিনের বিষয়ে মোটেও আগ্রহী নয়। তবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে কিউবার ভ্যাকসিন নীতি আবার এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। কিউবার স্বাস্থ্য খাত উন্নত হওয়ায় করোনার ভ্যাকসিন তারা নিজেরাই তৈরি করছে। এখন পরীক্ষার তৃতীয় পর্যায়ে আছে এবং ভালো কার্যকারিতা দেখাচ্ছে।

কিউবা শুধু নিজেদের জন্যই ভ্যাকসিন তৈরি করছে না। তারা গরিব দেশগুলোকে করোনা ভ্যাকসিন দিবে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খরব অনুযায়ী কিউবা ইতিমধ্যে গরিব এবং উন্নয়নশীল কিছু দেশের কাছ থেকে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডোজের অর্ডার পেয়েছে। এখন দেখার অপেক্ষা বাংলাদেশ, কিউবা ও অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাদের ভ্যাকসিন কূটনীতিতে কতটুকু সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভ্যাকসিন বিতরণ কার্যক্রমে দাতাদের ভূমিকা:

ধনী ও প্রভাবশালী দেশগুলোর এই জাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে কিছুটা হলেও আশার আলো ছড়াচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে গঠিত কোভ্যাক্স গ্লোবাল ভ্যাকসিন ফ্যাসিলিটি৷ এতে যোগ দিয়েছে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ। এর আওতায় ২০২১ সালের মধ্যে ভ্যাকসিনের ২ বিলিয়ন ডোজ সরবরাহ করা হবে৷ এর মধ্যে ৯২টি দেশ রয়েছে যারা বিনা পয়সায় পাবে, যার মধ্যে বাংলাদেশ একটি ৷ ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ ঠেকাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বহুত্ববাদের ঘোষণা দিয়ে ইতিমধ্যে কোভ্যাক্সকে ৮৭০ মিলিয়ন ইউরো দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে৷ চীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কোভ্যাক্স প্রকল্পের আওতায় এক কোটি ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে।

কোভ্যাক্সের আওতায় এখন পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রায় ৪ কোটি ভ্যাকসিন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে অর্ধেকই গেছে আফ্রিকার ৪০টির বেশি দেশে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র লক্ষ্যমাত্রা এতে অর্জিত হয়নি। ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’ এবং বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে ভারতে নতুন করে মহামারির ব্যাপক বিস্তৃতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্য ভ্যাকসিন সংগ্রহ কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলেছে।

কোভ্যাক্সে দান করলে প্রাপক দেশগুলোতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাব বিস্তার বিঘ্নিত হবে এই আশঙ্কায় রাশিয়া চীন, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মত অনেক প্রভাবশালী রাষ্ট্র নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে গ্যাভি কোভ্যাক্স এর আওতায় ভ্যাকসিন দান না করে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে ভ্যাকসিন দান করছে। ফলে বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিনের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

দেখা যাচ্ছে অনেক ছোট রাষ্ট্র, যেখানে করোনার প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি (যেমন ক্যারিবিয় ও ভারত মহাসাগরীয় দেশসমূহ), তারা প্রয়োজনেরও অধিক ভ্যাকসিন পাচ্ছে অথচ করোনা বিপর্যস্ত জনবহুল অনেক দেশ (যেমন ইউক্রেন, কলম্বিয়া, ব্রাজিল) প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম সংখ্যক ভ্যাকসিন পাচ্ছে। যেখানে কোভ্যাক্সের আওতায় উন্নত দেশগুলোর অনুন্নত দেশগুলোর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার কথা ছিল সেখানে প্রভাবশালী দেশগুলোর স্বার্থপর নীতির কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভ্যাকসিন বিতরণ কার্যক্রম আজ হুমকির মুখে।

ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের ভবিষ্যৎ:

বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য কূটনীতি এই করোনার মহামারিকালে যা আর্জন করতে পারত, সেই সম্ভাবনাকে তিরোহিত করছে ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ। ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদে দোষী দেশগুলো ভ্যাকসিন বিশ্বায়নের উদার পথে হাঁটলে নিজের দেশেই ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনায় রাজনীতির জটিল খেলায় এদের কাছ থেকে গরীব দেশগুলোর বেশি কিছু আশা করার নেই।

ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের কল্যাণে উন্নত দেশগুলোতে হয়ত এই বছরের মধ্যেই নাগরিক জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে যেখানে গরীব দেশগুলোর আরও কয়েক বছর ভোগান্তির শিকার হতে হবে। নতুন জীবাণুর এই মহামারি অদূর ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন সময়ে দেখা দিতে পারে। এই আশঙ্কা ইতিমধ্যে পৃথিবীর মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে।

ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী ধনী দেশগুলো যদি মনে করে যে সবার আগে তারা দেশের মানুষকে ভ্যাকসিন দিয়ে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষিত করবে তাহলে সেটা হবে ভুল। কারণ বিশ্বায়নের এই যুগে ভ্যাকসিন না পাওয়া গরিব দেশগুলো থেকে নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে করোনা হানা দিবে ধনী দেশগুলোতে। এতে করে বিপর্যয় আরও বাড়বে বৈ কমবে না, এমনিভাবে সতর্ক করেছিলেন করেছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

উপসংহার:

বিশ্বে টিকার প্রয়োজন বহাল থাকবে দীর্ঘদিন, হয়তোবা চিরদিন। তাই অদূর ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধকের ব্যবসা-কেন্দ্রিক রাজনীতি আরও বিস্তার লাভ করবে তাতেও কোনো সন্দেহ নাই। ফরাসি বিপ্লব যেমন বৈশ্বিক রাজনীতিতে সূচিত করেছিল এক বিরাট পরিবর্তনের তেমনি করোনার এই মহামারির ফলে পৃথিবীর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসতে চলেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি আজ রূপ নিয়েছে বৈশ্বিক ভ্যাকসিন রাজনীতিতে।

এই রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্মুখী মনোভাবে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারে রাশিয়া-চীন আপাতত এগিয়ে গেল। এ রাজনীতির খপ্পরে পড়ে কোন অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত যাতে না নেওয়া হয় সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সচেষ্ট থাকতে হবে। মহামারি সকলের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, বিশ্ববাসীর ভাগ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্বে এখনও হু হু করে ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে এবং বিশ্বের অর্থনীতিও মন্দার হুমকির মধ্যে আছে।

এ অবস্থায় মহামারির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে হবে।বস্তুত, এখন ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ কিংবা ভ্যাকসিন কূটনীতি নয়, বরং চাই ভ্যাকসিনের বিশ্বায়ন। অর্থনীতির বিশ্বায়নের এই যুগে কোভিড-১৯ ভাইরাসকে পরাজিত করতে এর কোনো বিকল্প নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি দেশ বা অঞ্চলও ভাইরাসের অভয়ারণ্য হিসেবে থেকে যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই বিশ্ব মহামারি থেকে নিষ্কৃতি পাবে না।

তথ্যসুত্রঃ The Daily Star, নতুন দেশ, বণিক বার্তা, দৈনিক প্রথম আলো, DW News,The Guardian

ভ্যাকসিন কূটনীতি অর্থনীতি ও বাংলাদেশ ছাড়া আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আপডেট পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল যোগ দিতে পারেন। পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!