ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ

ফোকাস রাইটিং : ব্লু ইকোনমি
Content Protection by DMCA.com

ফোকাস রাইটিং
ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ

অক্টোবর ২০২০, বিশ্ব একদিকে মহামারী করোনার ছোবলে দিশেহারা, অন্যদিকে বিশ্ব রাজনীতির চার বৃহৎ আঞ্চলিক শক্তিঃ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান, জাপানের রাজধানী টোকিওতে গোপন বৈঠকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের আগত রাজনৈতিক সমীকরণের ছক আঁকতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। এই আলোচনাকে চারদেশীয় নিরাপত্তা সংলাপ (Quadrilateral Security Dialogue) বা Quad বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

সংলাপে, এই চারটি রাষ্ট্রই একটি সাধারণ প্লাটফর্ম গঠনে জোটবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেছেন, যাতে রাষ্ট্রগুলো এই অঞ্চলে তাদের স্বাধীন ও নিরাপদ সমুদ্র যাত্রা নিশ্চিত করতে পারেন- এবং ইন্দো-প্যাসিফিক রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্র চর্চা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

কিন্তু বিভিন্ন স্ক্লাররা বলেন, এই তথাকথিত নিরাপত্তা সংলাপের মূলে রয়েছে এই অঞ্চলে চীনের ক্রমাগত প্রভাব বিস্তার, অর্থনৈতিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রে। চীনের এই উত্থান, এই বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থে নানাভাবে আঘাত করছে, বিশেষত আঞ্চলিক নিরাপত্তায়। যাইহোক, আমাদের আলোচনায় আমরা Quad সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা দেয়ার চেষ্টা করব, বিশেষত এই বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো এই নিরাপত্তা সহযোগিতাকে কিভাবে ব্যাক্ষা করছেন এবং Quad কে নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কেমন?

Quad এর সূচনাও হয়েছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরের তলদেশে মারাত্মক ভূমিকম্প হয়। ভূমিকম্পের ফলে এক ধ্বাংসাত্মক সুনামি আঘাত হানে, ফলে ইন্দো-প্যাসিফেকের উপকুলবর্তী দেশগুলোর অবকাঠামো ও জানমালের প্রচণ্ড ক্ষতি সম্মুখীন হয়। এই দূর্যোগ প্রশমনে ত্রাণ সহায়তা দিতে এই ৪টি দেশের নৌবাহিনী সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ শুরু করেন।

পরবর্তীতে তারা নিজেদের মধ্যকার যোগাযোগ বৃদ্ধিতে সামুদ্রিক সহযোগিতা (Maritime Co-operation) এর উপর বেশি জোর দেন। ফলে ২০০৭ সালে, কিভাবে চীনের প্রভাবকে প্রশমিত করা যায় তার উপর ধারাবাহিকভাবে অনেকগুলো সংলাপ হয় । কিন্তু সমন্বয়ের অভাবে এই আলোচনাগুলোর কোন কার্যকারি ফলাফল বা সফলতা মুখ দেখে নি।

২০১৭ সালে পুনুরায় চেষ্টা করা হয় এই প্লাটফর্মটাকে কার্যকর করতে। উল্লেখ্য, যদিও এই দীর্ঘসময়ে সরকারিভাবে Quad এর কার্যকারিতার ব্যপারে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি, তবুও একাডেমিক লেভেলে অনেক গবেষণা করা হয়েছে এই নিরাপত্তা জোটের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে।

২০১৭ সালের আলোচনায় সরাসরি চীনের উত্থানে Quad এর অংশীদাররা যেভাবে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দৌড়ে পিছয়ে পরছে তাকে ইংগিত করা হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এই চারটি রাষ্ট্র অনেকাংশে চীনের সাপ্লাই চেইনের উপর নির্ভরশীল, বিশেষত জাপান ও ভারত, এবং চীন তাদের ক্ষেত্রে প্রথম বা দ্বিতীয় সর্ব বৃহৎ বানিজ্যিক অংশীদার।

তাই, এই রাষ্ট্রগুলো, যুক্তরাষ্ট্র বাদে, চীনকে রাগানোর সাহস তেমন দেখাতে চাচ্ছেনা।  অন্যদিকে, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতের চিন্তার বিষয়টি হল চীনের এই উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের যে একচ্ছত্র প্রভাবটা ছিল তা অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে।

এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো অনেক আগে থেকেই এই ভীতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলো যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়া তাদের স্বার্থের ক্ষেত্রে কিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এই ভীতিটা বাস্তবে রূপ নেয় যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসে “America First” স্লোগান নিয়ে পাশাপাশি ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (TPP) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয় ট্রাম্প। এই সুযোগটাই মূলত চীনের রাষ্ট্রপতি সি জিং পিং ব্যবহার করেছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধিতে।

২০১৭ পরবর্তী আলোচনায় রাষ্ট্রগুলো বারংবারই Quad এর ব্যবহারিক দিকটাকে বেশি জোর দিয়েছেন। যেমনঃ ২০২০ এর অক্টোবরে যে সংলাপটি হল সেখানে এই বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো ভারত মহাসাগরে একটি সমন্বিত নৌ-মোহরার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যকার বিশ্বাসের জায়গাকে আরো দৃঢ় করার প্রস্তাব রাখেন এবং নভেম্বরে সেই মোহড়াটি পরিচালিত হয়।

এই মহড়ায় এই ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ মহাসাগরে চীনের সাবমেরিনগুলোকে নজরবন্দি করে রাখার ক্ষেত্রে সকল ধরনের টেকনিকাল ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ব্যপারে বেশি জোর দেয়া হয়েছে, এবং আমরা দেখেছি এই মহড়াকে কেন্দ্র করে চীনকে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে। এই মহড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটা হল এখানে একটা শক্ত প্লাটফর্ম সৃষ্টি হয়, ফলে এই চারটি রাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক আকারে সহযোগিতা মূলক সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে পারস্পারিক শক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতি প্রদান করে।

Quad ও জাপানঃ

২০১৭ পরবর্তী Quad ধারণাটিকে বাস্তবে রূপায়িত করতে সবচেয়ে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন জাপান ও জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিনজো আবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থান চীনের নিকট প্রতিবেশি জাপানের জন্য সবচেয়ে বেশি স্বার্থ-বিরোধী হয়ে উঠছিল।

দক্ষিন চীন সাগরের সাথে ভারত মহাসাগরকে সংযুক্ত করার যে কৌশল জাপানের ছিল সেক্ষেত্রে একমাত্র ও বৃহৎ বাঁধাই ছিল চীন। জাপান অনেক আগে থেকেই এই অঞ্চলে একটি নতুন অর্ডার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে আসছে যেখানে থাকবে না চীনের কোন অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক ও স্ট্রাটেজিক প্রভাব।

দীর্ঘদিন ধরে জাপা্ন ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে নিরাপত্তা টাই জোরদার করতে খুব প্রচেষ্টা চালিয়েছে। গত এক দশক ধরে জাপান অস্ট্রেলিয়ার সাথে তার প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরো জোরদার করেছে। Reciprocal Access Agreement এর মাধ্যমে তারা প্যাসিফিক অঞ্চলে সমন্বিত সামরিক মহড়া ও দূর্যোগ প্রশমন কার্যক্রম পরিচালিত করছে।

এছাড়াও, সামরিক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ, ও প্রতিরক্ষার সরঞ্জাম বিনিময়ের ক্ষেত্র প্রসারের স্বার্থে জাপান- ভারতের সাথে Acquisition and Cross-servicing Agreement স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি গুলোর মাধ্যমে জাপান এই দুইটি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে আরো বৃহৎ ও মার্জিত আকারে পরিচালিত করেন।

জাপান বরাবরই দক্ষিন কোরিয়াকে এই প্লাটফর্ম- অর্থাৎ কোয়াড থেকে দূরে রাখতে চেয়েছে। কারণ, দক্ষিণ কোরিয়া সবসময়ই যুক্তরাষ্ট, জাপান ও দঃ কোরিয়া বিষয়ক যেকোন নীতিতে সহজে মত পরিবর্তন করে ফেলে। ফলে প্রস্তাবনাটির ভবিষ্যৎ সবসময়ই সংকীর্ণ হয়ে পরে। এর জন্যই জাপান কোয়াডকে একটি উপযুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছে যার মাধ্যমে জাপান তার নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জোরদার করতে পারে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপর তার সামরিক নিরাপত্তার নির্ভরশীলতাও কমাতে পারে।

Quad ও অস্ট্রেলিয়াঃ পুরোটা পড়ুন

ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ ছাড়া আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।