বাচ্য : বিস্তারিত আলোচনা, শ্রেণিবিভাগ ও বাচ্য পরিবর্তন

বাচ্য শ্রেণিবিভাগ ও পরিবর্তন
Content Protection by DMCA.com

বাচ্য : বিস্তারিত আলোচনা, শ্রেণিবিভাগ ও  বাচ্য পরিবর্তন

বাংলা ব্যাকরণে বাচ্যের ধারণা নিয়ে বহু শিক্ষার্থীর মনে দ্বিধা আছে। প্রচলিত ব‌ইগুলিতে বাচ্যের আলোচনা বিভ্রান্তিকর। সেই বিভ্রান্তি দূর করে বাচ্যের সম্পূর্ণ ধারণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আজকের আলোচনা। বাচ্যের আলোচনার শুরুতেই আমরা তিনটি বাক্য নেবো।

১. আমি ব‌ই পড়েছি।
২. ব‌ই আমার দ্বারা পড়া হয়েছে।
৩. আমার ব‌ই-পড়া হয়েছে।

এই বাক্য তিনটির অর্থ একেবারে হুবহু এক, কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য আছে কেবল গঠনে। একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে গঠনের পার্থক্যটিও মূলত ক্রিয়াপদেই সীমাবদ্ধ। অন্য পদগুলি ততটা বদলায়নি। এখন আমরা বাক্য তিনটিকে উদ্দেশ্য ও বিধেয়ে ভেঙে দেখবো।

১. আমি | ব‌ই পড়েছি। — কর্তা ‘আমি’ এই বাক্যের উদ্দেশ্য
২. ব‌ই | আমার দ্বারা পড়া হয়েছে। — কর্ম ‘ব‌ই’ বাক্যের উদ্দেশ্য রূপে ব্যবহৃত হয়েছে।
৩. আমার ব‌ই-পড়া | হয়েছে। — ‘আমার ব‌ই পড়া’ অংশটি বাক্যের উদ্দেশ্য রূপে ব্যবহৃত হয়েছে।

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি তিনটি বাক্যের অর্থ এক হলেও তিনটি বাক্যের উদ্দেশ্য আলাদা এবং তার ফলে বিধেয়রূপী সমাপিকা ক্রিয়াটিও আলাদা হয়ে গেছে। ১নং বাক্যে ক্রিয়াপদ ‘পড়েছি’। ২ নং বাক্যে ক্রিয়াপদ ‘পড়া হয়েছে’, ৩ নং বাক্যে ক্রিয়াপদ ‘হয়েছে’। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো ২ নং বাক্যের ‘পড়া’ পদটি বিশেষণ কিন্তু ৩ নং বাক্যের ‘পড়া’ পদটি বিশেষ্য।

এবার মূল আলোচনায় আসি। আমাদের উপরোক্ত তিনটি উদাহরণের প্রথমটি কর্তৃবাচ্য, দ্বিতীয়টি কর্মবাচ্য এবং তৃতীয়টি ভাববাচ্যের উদাহরণ। এখন আমরা এই তিন বাচ্যের আলোচনা পৃথক ভাবে করবো এবং সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে বাচ্য কাকে বলে জেনে নেবো

বাচ্য কাকে বলে?
ক্রিয়াপদের প্রকাশভঙ্গির যে বৈচিত্র্যের কারণে বাক্যে কখন‌ও কর্তার, কখনও কর্মের আবার কখনও ক্রিয়ার ভাবটির প্রাধান্য হয়, তাকে বাচ্য বলে।
তার মানে, বাচ্য হল ক্রিয়াপদের বিভিন্ন প্রকাশভঙ্গি।

বাচ্য কয় প্রকার?
প্রথাগত ধারণায় বাচ্য ৪ প্রকার ও আধুনিক ধারণায় বাচ্য ২ প্রকার। বাচ্যের আধুনিক ধারণার আলোচনা আমরা পরে করছি‌।

কর্তৃবাচ্য:
যে বাচ্যে ক্রিয়াপদটি কর্তার অনুগামী হয় এবং কর্তাই বাক্যের উদ্দেশ্য রূপে ক্রিয়াপদ ও সমগ্র বাক্যকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে কর্তৃবাচ্য বলে। ভাষায় কর্তৃবাচ্যের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। যেমন: ছেলেরা বল খেলছে, আমরা ব‌ই পড়বো, তুমি এখন‌ই একবার এসো, রমা আজ রান্না করেছে, মা এখন বাড়িতে নেই, ছেলেটি অনেক বড়ো হয়েছে, ইত্যাদি।

এই বাক্যগুলিতে দেখা যাচ্ছে কর্তাই বাক্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ক্রিয়াপদটি কর্তার অনুগামী। কর্তা যে পুরুষের হবে, সমাপিকা ক্রিয়া সেই পুরুষের হবে।

কর্মবাচ্য:
যে বাচ্যে ক্রিয়াপদটি কর্মের অনুগামী হয় এবং কর্ম‌ই বাক্যের উদ্দেশ্যের স্থানে ব’সে বাক্যকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে কর্মবাচ্য বলে।
যেমন: ১. ছেলেটি প্রহৃত হয়েছে। অর্থাৎ কেউ বা কারা ছেলেটিকে প্রহার করেছে। ছেলেটি আসলে কর্ম।

২. এই পুরস্কার আমাকে প্রদত্ত হয়েছ। -এই বাক্যে দুটি কর্ম আছে। ‘পুরস্কার’ মুখ্য কর্ম ও ‘আমাকে’ গৌণ কর্ম। দুটি কর্মের মধ্যে একটি কর্ম (পুরস্কার) বাক্যের উদ্দেশ্য হয়েছে। অন্য কর্মটি বিধেয় অংশে স্থান পেয়েছে। ক্রিয়াপদ ‘প্রদত্ত হয়েছে’ পুরোটা।

৩. তার পর আমি পুলিশের দ্বারা ধৃত হলাম। -এখানে লক্ষণীয় ‘আমি’ কর্মটি উত্তম পুরুষ, তাই ক্রিয়াপদ ‘ধৃত হলাম’ উত্তম পুরুষের অনুগামী হয়েছে। কর্মবাচ্যের সমাপিকা ক্রিয়াটি কর্মের পুরুষ অনুসারে গঠিত হয়। কর্মের পুরুষ বদলে গেলেই কর্মবাচ্যের ক্রিয়া বদলে যায়।

ভাববাচ্য:
যে বাচ্যে ক্রিয়ার ভাবটিই প্রাধান্য পায়, ক্রিয়াপদটি কর্তা বা কর্মের অনুসারী হয় না, তাকে ভাববাচ্য বলে।

ভাববাচ্যের উদাহরণ:
১. আমার খাওয়া হয়েছে।
২. তোমার খাওয়া হয়েছে।
৩. রামের খাওয়া হয়েছে।

এই তিনটি উদাহরণে দেখা যাচ্ছে কর্তা তিনটি আলাদা পুরুষের হলেও ক্রিয়াপদ প্রতি ক্ষেত্রেই প্রথম পুরুষের ক্রিয়া। কারণ ‘খাওয়া’ বিশেষ্যটি (ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য) বাক্যের উদ্দেশ্য রূপে কাজ করছে। ‘খাওয়া’ পদটি যেহেতু প্রথম পুরুষ, তাই প্রতি ক্ষেত্রে ক্রিয়াও প্রথম পুরুষের হয়েছে। মনে রাখতে হবে: ভাববাচ্যের সমাপিকা ক্রিয়া সব সময় প্রথম পুরুষের ক্রিয়া হয়।

ভাববাচ্যের আর‌ও উদাহরণ:
৪. আমাকে যেতে হবে।
৫. এবার ওঠা যাক।
৬. কোথায় যাওয়া হয়েছিলো?
৭. আমাদের পড়া হয়নি।
৮. তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
৯. এবার যাওয়া যেতে পারে।
১০. তোমার ভাত খাওয়া হয়েছে?

** একটি জরুরি তথ্য: কিছু কিছু ব‌ইয়ে লেখা আছে সকর্মক ক্রিয়ার ভাববাচ্য হয় না। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। অকর্মক ক্রিয়ার কর্মবাচ্য হয় না, এ কথা ঠিক কিন্তু সকর্মক ক্রিয়ার ভাববাচ্য হতে কোনো বাধা নেই। ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘ভাষাপ্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ গ্রন্থে সকর্মক ক্রিয়ার ভাববাচ্যের উদাহরণ দিয়েছেন। উপরের ১০ নং উদাহরণটি সকর্মক ক্রিয়ার ভাববাচ্যের উদাহরণ।

ভাববাচ্যের শ্রেণিবিভাগ:
ভাববাচ্য তিন প্রকারের হতে পারে।

১. গৌণকর্ম-কর্তা ভাববাচ্য: এই প্রকার ভাববাচ্যে কর্তায় ‘কে’ বা ‘এ’ বা ‘য়’ বিভক্তি যুক্ত হয়। কর্তাটিকে গৌণ কর্ম মনে হয়। ‘কাকে’ প্রশ্নের উত্তরে কর্তাকে পাওয়া যায়। যেমন: আমাকে যেতে হবে। তোমাকে আসতে হবে। তোমায় খেতেই হবে।
এই প্রকার ভাববাচ্যে ইতে-অন্ত অসমাপিকা ক্রিয়া (যেমন যেতে, খেতে) বাক্যের উদ্দেশ্য স্থানে থাকে। এটিই ক্রিয়ার ভাব। ভাববাচ্যের উদ্দেশ্য-স্থানীয় এই অসমাপিকা আসলে বিশেষ্য পদ।

২. সম্বন্ধ-কর্তা ভাববাচ্য: এই ধরনের ভাববাচ্যে কর্তায় সম্বন্ধ পদের বিভক্তি ‘র’, ‘এর’, ‘দের’ যুক্ত হয়। কর্তাকে সম্বন্ধ পদ বলে মনে হয়। ‘কার’ প্রশ্নের উত্তরে কর্তা পাওয়া যায়। যেমন: আমার যাওয়া হবে না। তোমার খাওয়া শেষ হলো না?

৩. লুপ্ত-কর্তা ভাববাচ্য: এই প্রকার ভাববাচ্যে কর্তা লোপ পায়। যেমন: এবার যাওয়া যেতে পারে। এবার বলা হোক।

কর্মকর্তৃবাচ্য:
অনেক সময় কর্ম‌ই বাক্যের কর্তা হয়ে ওঠে। তখন তাকে কর্মকর্তৃবাচ্য বলে। এই বাচ্যে কর্তার উল্লেখ থাকে না। ক্রিয়াটি কর্তৃবাচ্যের মতোই হয়। কর্মকর্তৃবাচ্য বিষয়ে বাংলা ব্যাকরণে বিতর্ক আছে। বিশেষত কেমন উদাহরণকে কর্মকর্তৃবাচ্য বলা যাবে তা নিয়ে বিভিন্ন লেখক ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। নিচে কর্মকর্তৃবাচ্যের প্রচলিত কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো।

কর্মকর্তৃবাচ্যের উদাহরণ:
শাঁখ বাজে। আলো জ্বলে উঠলো। বাস থামলো। ট্রেন চলছে। এই বাক্যগুলি কর্মকর্তৃবাচ্যের উদাহরণ।

কর্মবাচ্য ও ভাববাচ্যের পার্থক্য:
বাক্যের মধ্যে কর্ম না থাকলে, অর্থাৎ ক্রিয়াটি অকর্মক হলে কর্মবাচ্য হয় না, শুধুমাত্র ভাববাচ্য হয়। কিন্তু কর্ম থাকলে তার দুই বাচ্য‌ই হতে পারে। তখন কর্মবাচ্য ও ভাববাচ্যকে আলাদা করে চেনা অনেক সময় জটিল হয়ে যায়। কর্মবাচ্য ও ভাববাচ্যের পার্থক্য নির্ণয়ের একটি উপায় আছে। নিচে দুটি উদাহরণের সাহায্যে উপায়টি বোঝানোর চেষ্টা করলাম।
ব‌ইটি | আজকেই কেনা হয়েছে। – কর্মবাচ্য।
আমার ভাত খাওয়া | হয়েছে। – ভাববাচ্য।

উপরের দুটি বাক্যকে আমি উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের মাঝে একটি বড় দাঁড়ি দিয়ে ভাগ করে দিয়েছি। এইবার বাক্য দুটি পড়ে দেখুন, ওই দাঁড়ির জায়গায় অল্প থামলে বাক্যটিকে স্বাভাবিক লাগছে কিনা। লাগছে তো? দেখুন: কর্মবাচ্যে কর্মের পর থামছি এবং ভাববাচ্যে ক্রিয়ার কাজটির পর থামছি। এটিই কর্মবাচ্য ও ভাববাচ্যের পার্থক্য নির্ণয়ের নিয়ম।

আধুনিক ধারণায় বাচ্যের শ্রেণিবিভাগ:
আধুনিক ধারণায় বাংলা বাচ্যকে দু ভাগে ভাগ করা হয়েছে, কর্তা-বাচ্য ও ভাববাচ্য।

কর্তাবাচ্য দুই ভাগে বিভক্ত:
১. সম্পাদক কর্তাবাচ্য বা সাধক কর্তাবাচ্য
প্রকৃত কর্তাই যখন বাক্যে কর্তার স্থানে থাকে তখন তাকে সম্পাদক কর্তাবাচ্য বলে। অর্থাৎ প্রথাগত ধারণায় যা কর্তৃবাচ্য, আধুনিক ধারণায় তা-ই সম্পাদক কর্তাবাচ্য।
২. অসম্পাদক কর্তাবাচ্য বা সাধিত কর্তাবাচ্য
কর্ম যখন কর্তার স্থানে থাকে, তখন সেই বাচ্যকে অসম্পাদক কর্তাবাচ্য বলে। কর্ম প্রকৃত পক্ষে ক্রিয়ার সম্পাদক নয়, তাই এর এ রূপ নামকরণ হয়েছে। প্রথাগত ধারণার কর্মবাচ্য ও কর্মকর্তৃবাচ্য এই ভাগে পড়ে।

আধুনিক ধারণার ভাববাচ্য ও প্রথাগত ধারণার ভাববাচ্য এক‌ই। তাই এ বিষয়ে আলাদা করে এখানে কিছু বলা হলো না। প্রথাগত ধারণায় যে আলোচনা করা হয়েছে, তা যথেষ্ট।

■ বাচ‍্য চেনার কৌশল
বাচ‍্য চেনার ব‍্যাপারে অনেক ছাত্রছাত্রী সমস‍্যায় পড়ছে। আমার ব্লগে বাচ‍্য নিয়ে আলোচনা করব যথা সময়ে। কিন্তু তার এখনও দেরি আছে। আজ ছাত্রছাত্রীদের জন্য বাচ‍্য চেনার ১১টি সংক্ষিপ্ত অথচ কার্যকর কৌশল বলছি। বাচ্যের বিস্তারিত আলোচনা করেছি, তার লিংক‌ও নিচে দিলাম।

১. ক্রিয়াপদ যদি কর্তার পুরুষ ধরে হয়, তাহলে অবশ‍্য‌ই কর্তৃবাচ‍্য হবে। মনে রাখবে, জড় পদার্থ‌ও কর্তা হতে পারে। যেমন : সূর্য ওঠে।

২. এককর্মক ক্রিয়ার কর্মে যদি ‘কে’ বিভক্তি থাকে, তাহলে জানবে সেটি কোনোমতেই কর্মবাচ‍্য বা কর্মকর্তৃবাচ‍্য হবে না। কারণ ওই দুটি বাচ‍্যে কর্মকে কর্তা সাজতে হয় আর কর্তা সাজতে হলে কর্মে শূন্য বিভক্তি‌ দিতে হয়। যেমন: লোকটি প্রহৃত হল। টাকাকড়ি অপহৃত হয়েছে। ব‌ইটি আমার দ্বারা পড়া হয়েছে।

৩. প্রকৃত কর্তায় দ্বারা/কর্তৃক/দিয়ে অনুসর্গ থাকলে সেটি কর্মবাচ‍্য হ‌ওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। যেমন: কমিটি কর্তৃক পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। – কমিটি এখানে আসল কর্তা।

৪. মূল ক্রিয়াটিকে যদি ত/ইত প্রত‍্যয় যোগে বিশেষণে পরিণত করা হয়, (যেমন: পঠিত, ভুক্ত, গৃহীত, বর্জিত, পরিত্যক্ত ইত্যাদি) তাহলে সেটি প্রায় সব সময়‌ই কর্মবাচ‍্য। যেমন: স্থানটি পরিত্যক্ত হয়েছে।

তবে যদি ২ আর ৪ এর বিরল সংযোগ ঘটে, সেক্ষেত্রে ভাববাচ‍্য হবার সম্ভাবনা প্রবল। এমন হলে কর্মটি প্রাণিবাচক হবে। যেমন: “তোমাকে সত‍্যি সত‍্যি প্রহৃত হতে হল?” এখানে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে- কর্মবাচ‍্যের কর্তারূপী কর্মকে সত‍্যিকার কর্তার মর্যাদা দিয়ে গৌণকর্ম-কর্তা ভাববাচ্য তৈরি করা হচ্ছে ।

৫. কর্মকর্তৃবাচ্যে কখন‌ও প্রকৃত কর্তার উল্লেখ থাকে না। কর্মটিই কর্তার কাজ করে।

৬. ক্রিয়া অকর্মক হলে স্বাভাবিক ভাবেই তার কর্মবাচ‍্য সম্ভব নয়। তাতে কর্তায় দ্বারা/দিয়া যাই থাক।

৭. কর্মটি ক্রিয়ার ভাব-জাত বিশেষ‍্যের সাথে হাইফেন দিয়ে জুড়ে দেওয়া থাকলে সেটি অবশ‍্য‌ই ভাববাচ‍্য। যেমন: “আমার ভাত-খাওয়া শেষ হ’ল।”

৮. এছাড়া, ভাববাচ‍্যে কর্তায় কে/র-এর বিভক্তি থাকবে অথবা কর্তা থাকবে না।

৯. ভাববাচ‍্যে হ ধাতু আছে দেখেই সহসা ভাববাচ‍্য ধরতে নেই। কর্মবাচ্যেও হ ধাতুজাত ক্রিয়া লাগে।

১০. সমাপিকা ক্রিয়ার আগে ‘ইতে’ প্রত্যয়যুক্ত অসমাপিকা ক্রিয়া থাকলে এবং সমাপিকা ক্রিয়াটি হ ধাতু-জাত হলে ভাববাচ্য হবে। যেমন: আমাকে যেতে হবে।(যাইতে হ‌ইবে)

১১. কর্তা ও কর্ম চিনতে পারলে বাক্যের কর্তা ও কর্ম পরিবর্তন করে বাচ্য চেনা যায়।
ক) কর্তা বদলে তার জায়গায় ‘আমি’ বা ‘তুমি’ বসাতে হবে। যদি ক্রিয়াটি কর্তা অনুসারে বদলে যায়, তবে কর্তৃবাচ্য। যেমন: ছেলেরা খেলছে। আমি খেলছি। ছেলেরা পাল্টে ‘আমি’ করে দিতেই ক্রিয়া বদলে ‘খেলছি’ হল।
খ) কর্ম বদলে তার জায়গায় ‘আমি’ বা ‘তুমি’ দিলে যদি ক্রিয়াটি বদলে যায়, তাহলে কর্মবাচ্য হবে। যেমন: লোকটি জনতার দ্বারা প্রহৃত হয়েছে। তুমি জনতার দ্বারা প্রহৃত হয়েছ। এখানে কর্মটি বদলে দিতেই ক্রিয়াটি বদলে গেল।
গ) কর্তা ও কর্ম, দুটিকেই বদলে যে পুরুষ‌ই করা হোক, ক্রিয়া যদি না বদলায়, তাহলে ভাববাচ্য হবে। কারণ ভাববাচ্যের ক্রিয়া সব সময় প্রথম পুরুষে থাকে।
উদাহরণ:
তোমাকে রাস্তায় দেখা গেছে।
আমাকে রাস্তায় দেখা গেছে।
তাকে রাস্তায় দেখা গেছে।

বাচ্য পরিবর্তন করার নিয়ম

এবার আলোচনা করবো বাচ্য পরিবর্তন করার নিয়ম ও বাচ্য পরিবর্তনের উদাহরণ। প্রথমেই চলুন দেখে নিই কীভাবে কোনো বাক্যকে এক বাচ্য থেকে অন্য বাচ্যে রূপান্তরিত করা যায়।

কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্য পরিবর্তন
১. প্রথমেই দেখে নিতে হবে বাক্যটিতে কর্ম আছে কিনা। কর্ম না থাকলে কর্মবাচ্য করা যাবে না, ভাববাচ্য করতে হবে। যেমন “ছেলেটি সকালবেলা হাঁটতে বেরিয়েছে।” এই বাক্যে কর্ম নেই। তাই এর কর্মবাচ্য হবে না।

২. বাক্যের মধ্যে কর্ম থাকলে কর্মটিকে বাক্যের উদ্দেশ্য স্থানে বা কর্তার স্থানে নিয়ে আসতে হবে, কর্মে বিভক্তি থাকলে সেটি তুলে কর্মের বিভক্তি শূন্য করতে হবে। যেমন: “ক্ষিপ্ত জনতা লোকটিকে প্রহার করেছে।” লোকটি এই বাক্যের কর্ম, তাই কর্মবাচ্য করার জন্য ‘লোকটি’-কে বাক্যের উদ্দেশ্য স্থানে আনতে হবে। কর্মবাচ্যের রূপটি হবে: “লোকটি জনতার দ্বারা প্রহৃত হয়েছে।”
-এখানে ‘লোকটি’ বাক্যের গোড়ায় চলে এসেছে ও বাক্যের উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে এবং লোকটির বিভক্তি শূন্য হয়েছে।

৩. প্রকৃত কর্তায় দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক প্রভৃতি করণ কারকের অনুসর্গগুলি যুক্ত হবে। কর্তাকে করণ বলে মনে হবে। যেমন: পুলিশ কর্তৃক চোর ধৃত হল।

৪. ক্রিয়াটিকে ক্রিয়াবাচক বিশেষণে রূপান্তরিত করতে হবে। ক্রিয়াবাচক বিশেষণ কী, তা না জানা থাকলে বিশেষণ পদের আলোচনাটি আগে পড়ে নিন।

৫. ঐ বিশেষণের সঙ্গে হ ধাতুর ক্রিয়া যোগে কর্ম বাচ্যের সমাপিকা ক্রিয়া গঠন করতে হবে।

৬. সমাপিকা ক্রিয়ার পুরুষ হবে কর্মের পুরুষ অনুসারে। অর্থাৎ কর্ম যদি উত্তম পুরুষ হয়, তবে ক্রিয়াও উত্তম পুরুষ হবে, কর্ম যদি মধ্যম পুরুষ হয়, তবে ক্রিয়াও মধ্যম পুরুষ হবে। যেমন: ২ নং নিয়মের উদাহরণে ‘লোকটি’-র পরিবর্তে ‘আমি’ কর্ম হলে কর্মবাচ্যের রূপ হত : “আমি জনতার দ্বারা প্রহৃত হয়েছি।”

কর্তৃবাচ্য থেকে ভাববাচ্যে পরিবর্তন
১. কর্তায় কে অথবা র/এর বিভক্তি যোগ করতে হবে‌। যেমন: “আমি স্কুলে যাবো।” > “আমাকে স্কুলে যেতে হবে।” অথবা “আমার স্কুলে যাওয়া হবে।”

২. বাক্যের ক্রিয়াপদটিকে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য পদে পরিণত করতে হবে অথবা ‘ইতে’/’তে’ যোগে অসমাপিকা ক্রিয়া পদে পরিণত করতে হবে। যেমন: “আমার স্কুলে যাওয়া হবে।” / “আমাকে স্কুলে যেতে হবে।” ‘যাওয়া’ ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য, ‘যেতে’ অসমাপিকা। (ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য সম্পর্কে জানতে বিশেষ্য পদের আলোচনাটি পড়ুন।)

৩. বাক্যে কর্ম থাকলে কর্মটিকে হয় ক্রিয়াবাচক বিশেষ্যের সাথে যুক্ত করে দিতে হবে, অথবা কর্মে ‘কে’ বিভক্তি যুক্ত করে দিতে হবে। যেমন: “আমি বলটা ফেলে দিলাম।” > “আমার বলটাকে ফেলে দেওয়া হল।” এখানে ‘বল’ কর্মে ‘কে’ বিভক্তি দিয়ে দিলাম। আবার: আমি ভাত খেয়েছি। > আমার ভাত-খাওয়া হয়েছে। এখানে হাইফেন দিয়ে ‘ভাত’ কর্মকে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্যের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এই দুটিই ভাববাচ্য।

কর্মবাচ্য থেকে ভাববাচ্য পরিবর্তন
কর্মবাচ্য থেকে ভাববাচ্য সাধারণত করতে হয় না। তবু আমরা পদ্ধতি জেনে রাখবো, তাহলে বাচ্য বুঝতে সুবিধা হবে।

১. কর্মের প্রাধান্য দূর করতে হবে। বাক্যের সমাপিকা ক্রিয়া কর্মকে অনুসরণ করবে না, তার বদলে সব সময় প্রথম পুরুষকে অনুসরণ করবে।

২. যদি দেখা যায় কর্তৃবাচ্যে কর্মে বিভক্তি ছিলো, কর্মবাচ্যে লুপ্ত হয়েছে, তাহলে ভাববাচ্য করার সময় লুপ্ত বিভক্তিটি ফিরিয়ে আনতে হবে।
যেমন: কর্তৃবাচ্য: পুলিশ চোরকে ধরল। –বিভক্তি আছে।
কর্মবাচ্য: পুলিশ কর্তৃক চোর ধৃত হল। — বিভক্তি লুপ্ত।
ভাববাচ্য: পুলিশের চোরকে ধরা হল। — বিভক্তি ফিরে এল।

৩. কর্তায় দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক প্রভৃতি অনুসর্গ থাকলে অধিকাংশ সময় সেগুলি তুলে তার বদলে ‘কে’ বা ‘র-এর’ বিভক্তি জুড়তে হবে। যেমন: “পুলিশ কর্তৃক চোর ধৃত হল।” > “পুলিশের চোরকে ধরা হল।” কোনো কোনো সময় ভাববাচ্যেও কর্তার সাথে ‘দ্বারা’ যোগ করা হয়। যেমন: “আমার দ্বারা যাওয়া হবে না।” এখানে লক্ষ করুন ‘যাওয়া’ অকর্মক এবং অকর্মক ক্রিয়ার কর্মবাচ্য হয় না, যেমন ভাবেই হোক ভাববাচ্য‌ই হয়।

কর্ম বা ভাব বাচ্য থেকে কর্তৃ বাচ্যে রূপান্তর
কর্ম বা ভাব বাচ্য থেকে কর্তৃ বাচ্যে রূপান্তরিত করার জন্য কর্তাকে প্রাধান্য দিতে হবে। ক্রিয়াকে এমন রূপ দিতে হবে, যাতে সরাসরি বোঝা যায় যে কর্তাই কাজটা করছে। যেমন: “আমার যাওয়া হবে।” > “আমি যাবো।” ‘যাওয়া হবে’ বললে মনে হচ্ছে ‘যাওয়াটা’ নিজেই হবে, কিন্তু ‘যাবো’ বললে বোঝা যাচ্ছে যে কাজটি আমিই করবো। আবার “রাবণ রাম কর্তৃক নিহত হন।” বললে মনে হচ্ছে রাবণ‌ই নিহত হবার কাজটা করেছেন, কিন্তু আসলে রাম তাঁকে বধ করেন। যদি বলা হয় “রাম রাবণকে বধ করেন।” তাহলে মনে হচ্ছে রাম কাজটা করেছেন।

বাচ্য পরিবর্তনের উদাহরণ
১. ব‌ইটি আমি আগেই পড়েছি। (কর্মবাচ্যে রূপান্তরিত করো)
উত্তর: ব‌ইটি আমার দ্বারা আগেই পড়া হয়েছে।

২. তুমি আমাকে অপমান করেছো। (কর্মবাচ্যে )
উত্তর: আমি তোমার দ্বারা অপমানিত হয়েছি।

৩. সে কি সত্যিই আর আসবে? (ভাববাচ্যে)
উত্তর: তার কি সত্যিই আর আসা হবে?

৪. তুমি পড়বে। (ভাববাচ্যে)
উত্তর: তোমাকে পড়তে হবে।

৫. এখানে কিছু পাওয়া যায় না। (কর্তৃ বাচ্যে)
উত্তর: এখানে কিছু পাই না/পাবেন না/পাবে না।

৬. তুমি কি এখন খাবে? (ভাববাচ্যে)
উত্তর: তোমার কি এখন খাওয়া হবে?

৭. কোথায় গিয়েছিলে? (ভাববাচ্যে)
উত্তর: কোথায় যাওয়া হয়েছিলো?

৮. সে তোমাকে প্রতারণা করেছে। (কর্মবাচ্যে)
উত্তর: তুমি তার দ্বারা প্রতারিত হয়েছ।

৯. রাবণ রাম কর্তৃক নিহত হন। (কর্তৃবাচ্যে)
উত্তর: রাম রাবণকে বধ করেন।

১০. রাম রাবণকে বধ করেন। (ভাব বাচ্যে)
উত্তর: রামের রাবণকে বধ করা হয়।

বাচ্য থেকে প্রশ্নোত্তর
১. “আমাকে পড়তে হচ্ছে।” বাক্যটি কোন বাচ্য?
উত্তর: এটি ভাব বাচ্য।

২. “কোথায় থাকা হয়?” কোন বাচ্য?
উত্তর: এটি ভাব বাচ্য।

৩. কর্তৃবাচ্যের ক্রিয়া কাকে অনুসরণ করে?
উত্তর: কর্তৃবাচ্যের ক্রিয়া কর্তাকে অনুসরণ করে।
৪. কোন বাচ্যের রূপান্তর সম্ভব নয়?
উত্তর: কর্মকর্তৃবাচ্যের রূপান্তর সম্ভব নয়।

৫. “আমার যাওয়া হবে না।” এটি কোন বাচ্য?
উত্তর: এটি ভাব বাচ্য।

৬. “কাজটা ভালো দেখায় না।” কোন বাচ্যের উদাহরণ?
উত্তর: কর্ম বাচ্যের উদাহরণ।

৭. “সুতি কাপড় অনেক দিন টেকে।” বাক্যটি কোন বাচ্যের উদাহরণ?
উত্তর: এটি কর্তৃ বাচ্যের উদাহরণ। কেউ কেউ এটিকে কর্মকর্তৃবাচ্য বলে ভুল করেন, কিন্তু ‘টেকে’ ক্রিয়াটির উপর কাপড়ের অধিকার নিয়ে কোনো সংশয় নেই। কাপড় নিজেই টেকে, সেটাই তার ধর্ম। এখানে অন্য কর্তার অস্তিত্ব নেই। কাপড়ের ব্যবহারকারী এখানে কোনো কাজ করছে না।

৮. “তোমাকে হাঁটতে হবে।” এটি কোন বাচ্যের উদাহরণ?
উত্তর: এটি ভাব বাচ্যের উদাহরণ।

৯. বাঁশি বাঝে ঐ মধুর লগনে। এটি কোন বাচ্যের উদাহরণ?
উত্তর: এটি কর্মকর্তৃবাচ্যের উদাহরণ। কেউ কেউ অবশ্য এগুলিকে কর্তৃবাচ্য বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন।

১০. “জল পড়ে, পাতা নড়ে।” কোন বাচ্য?
উত্তর: কর্তৃবাচ্য। জল বা পাতা এখানে কর্ম নয়। জল বা পাতা এখানে কর্তা। কারণ জল নিজেই পড়ে, প্রকৃতির নিয়মে। পাতাও প্রকৃতির নিয়মে নড়ে। অনেকে বলেন হাওয়া পাতাকে নড়াচ্ছে, তাই হাওয়া আসল কর্তা। এই যুক্তি মানলে “শিশুটি জন্মগ্রহণ করল।” এই বাক্যে শিশু কর্তা নয়, কারণ তার বাবা মা তাকে জন্ম দিয়েছে; আবার “সূর্য উঠল।” বাক্যে সূর্য কর্তা নয়, কারণ পৃথিবী ঘুরছে বলেই সূর্য উঠছে। কর্তা নির্ণয় করার সময় প্রকৃতির নিয়মকে কর্তা হিসেবে দেখলে চলে না, এ সব ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ কর্তাকেই কর্তা ধরতে হয়।

১১. তার যেন আসা হয়। এটি কোন বাচ্যের উদাহরণ?
উত্তর: এটি ভাব বাচ্যের উদাহরণ।

বাচ্য : বিস্তারিত আলোচনা, শ্রেণিবিভাগ ও  বাচ্য পরিবর্তন ছাড়া আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন।