ফোকাস রাইটিং: ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা

পৃথিবী রক্ষায় জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ৫ দফা প্রস্তাব
Content Protection by DMCA.com

৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা

পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ধারণাটি প্রথমে গ্রহণ করে রাশিয়া। তাই বিশ্বে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নকারী দেশ রাশিয়া। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে, বাংলাদেশ ও সমান্তরে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মূল ভিত্তি। এ পরিকল্পনার মাধ্যমে বিভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে চলছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদকাল: জুলাই, ২০২০ থেকে জুন, ২০২৫।

  • প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা- ১৯৭৩-১৯৭৮
  • দ্বিবার্ষিক- ১৯৭৮-১৯৮০
  • দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা- ১৯৮০-১৯৮৫
  • তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা- ১৯৮৫-১৯৯০
  • চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা- ১৯৯০-১৯৯৫
  • পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা-১৯৯৭-২০০২
  • ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা- ২০১০-২০১৫
  • সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ২০১৬-২০২০
  • অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ২০২০-২০২৫

দেশের অর্থনীতিতে কভিড-১৯ মহামারির প্রভাবকে সামনে রেখে সরকার অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন হয়েছে। চলতি বছর ৩০ জুনে সপ্তম পঞ্চমবার্ষিকী পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে ‘কাউকে পিছনে ফেলে নয়’ স্লোগানকে সামনে রেখে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সূচকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এবং অঞ্চলকে চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব মূল্যায়নে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন একটি স্টাডি সম্পন্ন করছে; ওই স্টাডির ফলগুলো অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হবে। স্টাডিতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি করোনাভাইরাস সংকটের ফলে দারিদ্র্য হ্রাস কার্যক্রম এবং প্রবৃদ্ধি কীরূপ প্রভাবিত হবে তা বিশেষ গুরুত্বসহকারে মূল্যায়ন করা হবে

সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’-এর অঙ্গীকার অনুযায়ী ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে গ্রামীণ রূপান্তর। অর্থাৎ শহরের সুবিধা পৌঁছানোর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির বৈচিত্র্যায়ন করা হবে। ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য এই পরিকল্পনার যে ধারণাপত্রটি তৈরি করা হয়েছে সেখানে এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

জিইডির সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, ‘৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি তৈরি করা হবে দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে। এগুলো হচ্ছে- ত্বরান্বিত সমৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি। ইতোমধ্যেই উভয়ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। দ্রুত প্রবৃদ্ধি মাথাপিছু আয়ের ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।

নগর ও গ্রামাঞ্চল উভয় ক্ষেত্রেই আয় বেড়েছে। রেমিটেন্সের ব্যাপক প্রবাহের পাশাপাশি বাণিজ্য, পরিবহন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন সেবাখাতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক গ্রামেই অ-কৃষি খাতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কৃষি কর্মসংস্থান দিন দিন কমে যাচ্ছে। কৃষি শ্রমিকদের মজুরি আগের তুলনায় বেড়েছে। এছাড়া ক্রমবর্ধমান আয় বাড়ার কারণে গ্রামীণ রূপান্তর চলমান রয়েছে।’

ড. আলম আরও বলেন, ‘আধুনিক পরিবহন ও তথ্য প্রযুক্তিসেবা গ্রাম এবং নগরের মধ্যে ব্যবধান কমাতে সাহায্য করছে। রূপান্তরের এই গতিকে আরও ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি টেকসই করা হবে ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে। ’

পরিকল্পনায় বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দাভাব প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বেসরকারি বিনিয়োগকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। সেই সঙ্গে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগের হার জিডিপির ২২ শতাংশ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। তবে বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে শুধু ২৩ শতাংশ।

এই মন্দাভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারি বিনিয়োগ হার বৃদ্ধি করা হলেও সামগ্রিক বিনিয়োগ প্রচেষ্টা ৯ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বেসরকারি এবং মোট বিনিয়োগ হার বাড়ানোর জন্য অধিক প্রচেষ্টা চালানো হবে। সেই সঙ্গে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহ বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে—

১) কর্মসংস্থান তৈরিতে প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি গ্রোথ,
২) সবার সমান সুবিধা নিশ্চিত করতে সাম্য ও সমতা।
৩) জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করা।

কিন্তু এসবের জন্য প্রয়োজন জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করা। আমাদের দেশে বাজারের চাহিদার সঙ্গে শ্রমের জোগানের মিল নেই। কিন্তু চাহিদা মেটাতে সেই জায়গাগুলোতে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নিয়োগ হচ্ছে।

বাজার উপযোগী কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতার উন্নয়নের মাধ্যমে এ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। আমাদের দরকার উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চ কারিগরি শিক্ষা, যার মাধ্যমে আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলা করতে পারব। সরকার আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা করলেও বেসরকারি খাতকে ভবিষ্যতের প্রয়োজন মাথায় রেখে বিনিয়োগ করতে হবে। তা হতে হবে অন্তত ১৫-২০ বছরের কথা চিন্তায় রেখে। লক্ষ রাখতে হবে পরিকল্পনা, বিনিয়োগ যা–ই হোক না কেন, সবকিছু দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বিত পদ্বতিতে যেন হয়।

করোনায় চরম আঘাত এসেছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থানে। সেই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক খাতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তাই কর্মসংস্থানের বিষয়ে বলা হয়েছে, পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৭ অনুসারে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পরও কর্মসংস্থন সৃষ্টি সন্তোষজনক ছিল না। বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৬ শতাংশের বিপরীতে ২০১০ এবং ২০১৭ সালের মধ্যে কর্মসংস্থান ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি জিডিপি প্রবৃদ্ধির তুলনায় শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ।

কিন্তু ইতিবাচক দিক হল কৃষিতে কর্মসংস্থান ৪৮ শতাংশ থেকে কমে ৪১ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ শতাংশ হয়েছে। তারপরও নারী শ্রমশক্তির উচ্চতর অংশগ্রহণ, জনসংখ্যাগত রূপান্তর থেকে উঠে আসা ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তির প্রয়োজনের তুলনায় ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার খুবই কম।

এছাড়া কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক সেবা খাতেও কর্মসংস্থান কম। নির্মাণ কাজ এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে প্রযুক্তি প্রবর্তনের ফলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র কমে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে দক্ষতার অভাব একটি গুরুতর সমস্যা। প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং দক্ষতার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জগুলো অন্তর্ভুক্ত করে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সেগুলো সমাধানে গুরুত্ব দেয়া হবে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যসমূহ:

১. ৭৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
২. ৭৭ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ। যার ৭৬% বেসরকারি খাতের।
৩. ডেল্টা ২১০০ প্ল্যানের কার্যক্রম শুরু।
৪. ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.৫% অর্জন।
৫. দারিদ্র্যের হার ১২.১৭% এ নামিয়ে আনা৷

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এরই মধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ও সরকারের দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।

ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নে মোট পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা থাকছে ৪টি। ৮ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা হচ্ছে এর প্রথম। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ এবং সরকারের ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার অনুসরণ করা হবে। বাংলাদেশ ইতেমধ্যে নিম্ন মধ্যম আয়ের মর্যাদা অর্জন করেছে এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে প্রাথমিক উত্তরণের ভিত্তি স্থাপন করেছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ২০২৪ সালের মধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণ এবং এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য সহায়ক হবে।

৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছাড়া আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আপনার টাইমলাইনে শেয়ার করতে ফেসবুক আইকনে ক্লিক করুন-