ফোকাস রাইটিং : ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?

ফোকাস রাইটিং : ব্লু ইকোনমি
Content Protection by DMCA.com

ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা ও চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ
অথবা,
ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ
অথবা,
ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যখন স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতি ঠিক রাখতে লড়াই করে যাচ্ছে, তখন কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সুখবরের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে সবার মধ্যে আশার আলো জ্বলতে শুরু করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম এত অল্প সময়ে এযাবতৎ কমপক্ষে চারটি ভ্যাকসিনের সাফল্যের খবর বিজ্ঞানের জয়যাত্রারই আরও একটি বার্তা। সফল এই ভ্যাকসিনগুলো ফাইজার-বায়োএনটেক, মডার্না, অক্সফোর্ড-এস্ট্রাজেনেকা আর জামালিয়া (স্পুটনিক-৫) আবিষ্কার করেছে। এই ভ্যাকসিনগুলোর মধ্যে ফাইজার-বায়োএনটেক ও মডার্না আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৯৫ শতাংশ, অক্সফোর্ড-এস্ট্রাজেনেকার ৬২ থেকে ৯০ শতাংশ (ত্রুটিযুক্ত ফলাফল হিসেবে সম্প্রতি প্রমাণিত হয়েছে) আর জামালিয়া (স্পুটনিক-৫)-এর ৯২ শতাংশ।

এই ভ্যাকসিনগুলোর সফলতার খবরের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর সফল প্রয়োগ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিশ্বের সব দেশের জন্যই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছে এটি সঠিকভাবে, সঠিক সময়ে, সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ করে পৌঁছানো যেমন জরুরি, তেমনি যিনি এটি গ্রহণ করছেন তার তথ্য-উপাত্তও সঠিকভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করারও দরকার রয়েছে। তাই ভ্যাকসিনের সফলতা অর্জনের জন্য একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের কোনো বিকল্প নেই।

অনেক দেশই ইতিমধ্যে কোভিড ভ্যাকসিন কার্যক্রমের পরিকল্পনা পাকাপোক্ত করে ফেলেছে। যেমন অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী বছরের মার্চ থেকে দেশটিতে বয়স্ক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভ্যাকসিন প্রদানের মাধ্যমে ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু হবে এবং ২০২১ সালেই দেশটির প্রতিটি নাগরিক ভ্যাকসিন গ্রহণের সুযোগ পাবে। আর এজন্য দেশটি চারটি ভ্যাকসিন উত্পাদন কোম্পানির কাছ থেকে ভ্যাকসিন কিনেও ফেলেছে। ভ্যাকসিন কোন এলাকায়, কীভাবে, কোন সময়ে জনগণের মধ্যে প্রয়োগ করা হবে তার পরিকল্পনাও মোটামুটি ঠিক করা হয়েছে। এই ভ্যাকসিনগুলোর একটি বিরাট অংশ দেশটিতেই উত্পাদিত হবে। ভ্যাকসিন যে শুধু দেশটির কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষা দেবে তাই নয়, এটি নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণের জন্য ডিজিটাল ভ্যাকসিন পাসপোর্টের অনুসঙ্গ হিসেবে ব্যবহূত হবে। ভ্যাকসিন নিয়ে এমন পরিকল্পনা আর অগ্রগতি অনেক দেশই করে ফেলেছে।

বাংলাদেশ আশা করছে ভ্যাকসিন সংগ্রহের। সরকার তিন কোটি ভ্যাকসিন বিনামূল্যে জনগণকে দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে দেশে ভ্যাকসিনের প্রথম ৫০ লাখ ডোজ আসবে, যা ২৫ লাখ মানুষকে দেওয়া যাবে। তবে ভ্যাকসিনের ব্যবস্থাপনা ও অগ্রাধিকার তালিকা তৈরিই এখন চ্যালেঞ্জ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) সূত্র মতে, কভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় পর্যায়ে তিনটি কমিটি গঠিত হয়েছে।

● প্রথমটি কভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটি, এই কমিটির সভাপতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
● পরের কমিটি টিকা ব্যবস্থাপনা ওয়ার্কিং গ্রুপ। এর নেতৃত্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব।
● জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয় কমিটির নাম কভিড-১৯ টিকা বিতরণ ও প্রস্তুতি কমিটি। এর নেতৃত্বে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন)।

দায়িত্বে যারাঃ
১.টিকাবিষয়ক জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক।
২.সদস্য সচিবের দায়িত্বে থাকবেন জেলা সিভিল সার্জন।
৩.কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে থাকবেন জেলা সদর আসনের সংসদ সদস্য।
৪. উপজেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
৫.আর সদস্য সচিব থাকবেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা।
৬.উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকবেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

করোনার টিকাবিষয়ক খসড়া জাতীয় পরিকল্পনাতেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করার কথা বলা আছে।সেসব কমিটির প্রধান জেলা সিভিল সার্জন বা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তাতে রাখা হয়নি।

কমিটির কাজঃ
উপজেলা কমিটির চার দফা কাজের কথা বলা হয়েছে।প্রথম কাজ মহামারী মোকাবিলায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মী, সম্মুখসারির কর্মী, রোগ প্রতিরোধক্ষমতাহীন জনগোষ্ঠী, বয়োজ্যেষ্ঠ জনগোষ্ঠী, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি।যে টিকা দেশে আসবে, তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়ার চিন্তা চলছে।

কারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাবেন এ ভ্যাকসিনঃ
১.সবার আগে ভ্যাকসিন পাবেন করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিতরা৷
২.তারপর পাবেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তা যারা মানুষের সরাসরি সংস্পর্শে কাজ করেন৷
৩. তারপর অগ্রাধিকার পাবেন ৬৫ বছরের উপরে যাদের বয়স সে-সমস্ত নাগরিক৷
৪.পর্যায়ক্রমে বাকিরাও টিকার আওতায় আসবেন৷

চ্যালেঞ্জসমূহঃ
১.দেশের সব মানুষের জন্য একসঙ্গে টিকার ব্যবস্থা করা সম্ভব না। যে টিকা দেশে আসবে, তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়ার চিন্তা চলছে। অগ্রাধিকারের এই তালিকা তৈরির কাজ জটিলতা তৈরি করতে পারে। প্রতি ব্যক্তির টিকার দুটি ডোজের প্রয়োজন পড়বে। তাই সারা দেশে এই অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় ভ্যাকসিন কার্যক্রম সম্পন্ন করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

২.বাংলাদেশে একটা ভ্যাক্সিনের ট্রায়াল হওয়া দরকার ছিল। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী কীভাবে ভ্যাকসিনে রিঅ্যাক্ট করবে, সেটা দেখার জন্য। আর, এটা একটা চ্যালেঞ্জ বলা চলে।

৩. প্রতিটি ভ্যাকসিন সংরক্ষণের জন্য ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে। যেমন ফাইজার ও মডার্নার উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের জন্য হিমাংকের নিচে যথাক্রমে ৭০ ও ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন। মর্ডানার ভ্যাকসিন এক মাস পর্যন্ত এবং ফাইজারের উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন ৫ দিন পর্যন্ত ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা সম্ভব। তাই এ ব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। যা বাংলাদেশ কতটা মোকাবেলা করতে পারবে ভাবার বিষয়।

৪.ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার জন্য ভ্যাকসিন সংগ্রহের পর থেকে প্রাপকের শরীরের দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগ ও এর কার্যক্ষমতা পুরোপুরি অনুসরণ করার জন্য তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। আর,এসব নিয়মিত তদারকি করা বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ।

৫.কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, টিকাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ, সাপ্লাইচেইন ও ব্লকচেইন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, নীতি নির্ধারক, প্রশাসক ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কর্মিবাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে, যা বাংলাদেশে অপ্রতুল।

করণীয়ঃ
কোভিড ১৯ থেকে সুরক্ষায় অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের সঙ্গে অন্য ভ্যাকসিনগুলো সংগ্রহের জন্য সফল উদ্যোগ গ্রহণ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নেওয়া দরকার। একই সঙ্গ এই ভ্যাকসিনগুলো ব্যবস্থাপনার জন্য সব ধরনের পরিকল্পনাও করা দরকার। বাংলাদেশে বিপুল জনসংখ্যার মানুষের জন্য ভ্যাকসিন সংগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে কাদের, কোন এলাকায়, কীভাবে, কোন সময়ে এটি প্রয়োগ করা হবে, তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের নির্দেশনা নির্ধারণ করা অত্যাবশ্যক।

যেহেতু দুই দফায় ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে হবে, তাই ভ্যাকসিন প্রাপককে যথাযথ অনুসরণযোগ্য পদ্ধতিরও প্রয়োজন রয়েছে। অল্প সময়ে যত বেশি নাগরিককে এই ভ্যাকসিনের আওতায় আনা সম্ভব হবে, দেশের জন্য তত দ্রুত মঙ্গল বয়ে আনা সম্ভব হবে। আর এর জন্য দক্ষ জনবল, লজিস্টিক সাপোর্ট ও ডাটা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও অত্যাবশ্যক।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, টিকাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ, সাপ্লাইচেইন ও ব্লকচেইন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, নীতি নির্ধারক, প্রশাসক ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কর্মিবাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে, যারা এই কাজকে পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সফলভাবে কার্যকর করতে পারবেন।

আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন।

আপনার টাইমলাইনে শেয়ার করতে ফেসবুক আইকনে ক্লিক করুন।