ফোকাস রাইটিং: পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সম্ভাবনা

ফোকাস রাইটিং : ব্লু ইকোনমি
Content Protection by DMCA.com

ফোকাস রাইটিং: পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সম্ভাবনা

বহু বছর আমাদের যোগাযোগ ছিল নদীনির্ভর। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে সড়ক যোগাযোগের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ ক্ষেত্রেও বাধা ছিল অসংখ্য নদনদী। যেকোনো সড়ক তৈরি করতে গেলেই ছোট-বড় নদী অতিক্রম করতে হতো। অনেক ফেরি চালু ছিল। উত্তরাঞ্চলের মানুষ কখনও ভাবতেই পারেনি সকালে রওনা দিয়ে দুপুরে ঢাকা পৌঁছে যাবে। আবার কাজ শেষ করে সেদিনই ফিরে আসা সম্ভব হবে। ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর উদ্বোধন করা হয়। সে সময়েই বহুল প্রতীক্ষিত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের সুবিধার জন্য স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

নিজস্ব অর্থায়নে এমন একটি সেতু নির্মাণ করতে যাওয়ার কাজটি সহজ ছিল না। বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ করেও ঘুষ ও দুর্নীতির মতো মিথ্যা অভিযোগে তা প্রত্যাহার করেছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ ছিল প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত দূরদর্শী ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। তখন সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এ বিশাল সেতু নির্মাণকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে। এ চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশই যে জিতবে, সেটি ক্রমেই দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

স্বপ্নের পদ্মা সেতুর ৪১তম স্প্যান এরই মধ্যে বসানো শেষ হয়েছে এবং এতে সেতুর ছয় হাজার ১৫০ মিটার দৃশ্যমান হয়েছে। আগামী বিজয় দিবসের আগেই ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে দ্বিতল পদ্মা সেতুটির সবকটি স্প্যান বসানো শেষ হলো। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৪২টি পিলারের ওপর ৪১টি স্প্যান বসিয়ে ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে। এরই মধ্যে সবকটি খুঁটি, স্প্যান ও স্ল্যাব বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। এখন সেতুতে পিচঢালাই, স্থানে স্থানে মসৃণ করা এবং বাতি ও আলোকসজ্জার কাজ বাকি। এগুলো শেষ হলেই আগামী জুনের মধ্যেই সেতু আনুষ্ঠানিকভাবে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। মূল সেতুর কাজ প্রায় ৯৪ শতাংশ শেষ হয়েছে। নদীশাসনকাজের অগ্রগতি প্রায় ৮৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৮৭ শতাংশ।

পদ্মা বহুমুখী সেতু কেবল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলা নয়, পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতিই বদলে দেবে। আরও বিশদভাবে বলতে গেলে এই সেতু দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ, বাণিজ্য, পর্যটনসহ অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে এই সেতু আসলেই দেশের মানুষের স্বপ্নের সেতু হয়ে উঠবে।এছাড়া এ সেতুটি ভবিষ্যতে ট্রান্স-এশীয় রেলপথের অংশ হবে। তখন যাত্রীবাহী ট্রেন যত চলবে, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি চলবে মালবোঝাই ট্রেন। ডাবল কনটেইনার নিয়ে ছুটে চলবে ট্রেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হবে মংলা ও পায়রা বন্দর। অর্থনীতিতে যুক্ত হবে নতুন সোনালি স্বপ্ন এবং দেশের প্রবৃদ্ধিতে এ সেতু ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে।

আরও পড়ুনঃ পদ্মা সেতু সম্পর্কিত সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে একটি দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আবর্তিত হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে কৃষিপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং শিল্পজাত পণ্যসামগ্রী সহজে ও স্বল্প ব্যয়ে স্থানান্তর করতে সুবিধা হয়। এর ফলে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, শিল্প ও ব্যবসার প্রসার ঘটে। এজন্য যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পদ্মা সেতু এক্ষেত্রে অর্থনীতির ভিত্তি ও সোনালি সোপান হিসেবে কাজ করবে। পদ্মা সেতুর কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির চাকা ঘুরে যাবে দ্রুত বেগে। বাড়বে জীবনযাত্রার মান ও কর্মসংস্থান। সেতুর একপ্রান্ত ছুঁয়ে থাকবে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া, অন্যপ্রান্ত শরীয়তপুরের জাজিরা। পদ্মার বুকে যে স্বপ্নের যাত্রা হয়েছিল তা এখন বাস্তবে রূপ দিতে প্রতিদিন ছয় থেকে সাত হাজার শ্রমিক ঘাম ঝরাচ্ছেন। এ সেতু নির্মাণের সুফল হিসেবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অন্যতম প্রধান উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হবে এবং কোটিরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বয়ে আনবে সুসংবাদ।

উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য জেলার অধিবাসীদের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধক ছিল যমুনা নদী। এ নদীর ওপর যখন বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মিত হলো, পাল্টে যেতে শুরু করল অর্থনীতির গতিপথ। সেতুর মাধ্যমে উত্তরবঙ্গ নানাভাবেই লাভবান হয়েছে। স্বাচ্ছন্দ্য ফিরেছে অনেকের। দেশের জন্য এ পরিবর্তন ইতিবাচক। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু সেতুর নির্মাণব্যয় উঠে এসেছে। বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে মোট খরচ হয়েছিল তিন হাজার ৭৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরের জুন থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ২১ বছরে সেতুর টোল আদায় থেকে টাকা এসেছে পাঁচ হাজার ৩৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল ২৫ বছরে সেতুতে বিনিয়োগের টাকা তুলে আনার। কিন্তু সেই টাকা উঠে এসেছে সাত বছর আগেই, যা জাতীয় অর্থনীতির সুবাতাসকেই নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ ঘনবসতির দেশ হওয়ার কারণে এ ধরনের বড় সেতু নির্মাণে দুটি লাভ হয়। সেতু নির্মাণে যে বিনিয়োগ করা হয় তা দ্রুত উঠে আসে, সঙ্গে মুনাফাও। সেতুর সঙ্গে যুক্ত অঞ্চলগুলোর অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি হয়, বঙ্গবন্ধুর সেতুর মাধ্যমে যেটার বাস্তবায়ন ঘটেছে।

পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রথম কোনো সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এমনিতেই কৃষিতে উন্নত। এই সেতু হয়ে গেলে তাদের কৃষিপণ্য খুব সহজেই ঢাকায় চলে আসবে। মংলা ও পায়রা বন্দর এবং বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী ও বন্দরনগর চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। পুরো দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। কোনো বিনিয়োগের ১২ শতাংশ রেট অব রিটার্ন হলে সেটি আদর্শ বিবেচনা করা হয়। এই সেতু হলে বছরে বিনিয়োগের ১৯ শতাংশ করে উঠে আসবে। কৃষি, শিল্প, অর্থনীতি, শিক্ষা, বাণিজ্যÑসব ক্ষেত্রেই এই সেতুর বিশাল ভূমিকা থাকবে। পদ্মা সেতুর নির্মাণ শেষ হলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের কুয়াকাটা ও সুন্দরবনসংলগ্ন ছোট ছোট বিভিন্ন দ্বীপ মালদ্বীপের মতো পর্যটন-উপযোগী করা যাবে। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন ও পায়রা বন্দরকে ঘিরে দেখা দেবে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা।

দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন চর ও দ্বীপকে কেন্দ্র করে মালদ্বীপের মতো পর্যটনের বিশাল জগৎ তৈরি করা সম্ভব। পদ্মা সেতু চালু হলে সেই সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যাবে। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে কক্সবাজারের চেয়ে কম সময়ে সুন্দরবন ও কুয়াকাটায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। কক্সবাজার যেতে যেখানে সময় লাগে ১০-১২ ঘণ্টা, সেখানে কুয়াকাটায় পৌঁছানো যাবে মাত্র ছয় ঘণ্টায়, ফলে নিঃসন্দেহে পর্যটকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে। পায়রা বন্দরের সঙ্গে বুলেট ট্রেন চালুর কথা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে কুয়াকাটা ও আশপাশে বেশ কিছু দ্বীপের সঙ্গে ভালো ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হবে। তাহলে পর্যটকরা আকৃষ্ট হবেন। এজন্য এরই মধ্যে অনেক দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর এবং এর আশপাশে বিনিয়োগ করা শুরু করেছে।

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিজয়ের নতুন দরজা পদ্মা সেতু

পদ্মা সেতুকে ঘিরে পদ্মার দুই পাড়ে সিঙ্গাপুর ও চীনের সাংহাই নগরের আদলে শহর গড়ে তোলার কথাবার্তা হচ্ছে। নদীর দুই তীরে আসলেই আধুনিক নগর গড়ে তোলা সম্ভব। তবে সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। এরই মধ্যে বেশকিছু আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এই সেতু ঘিরে কী কী হতে পারে, কোথায় শিল্পকারখানা হবে, কোথায় কৃষিজমি হবে সেসব ভেবেচিন্তে করতে হবে। প্রয়োজনে এখানে প্রশাসনিক রাজধানী করা যেতে পারে। এই সেতুকে ঘিরে পর্যটনে যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। অনেক আধুনিক মানের হোটেল, মোটেল ও রিজোর্ট গড়ে উঠবে। এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সেতুটি বাস্তবায়িত হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার এক দশমিক দুই শতাংশ বেড়ে যাবে। আর প্রতিবছর দারিদ্র্য নিরসন হবে শূন্য দশমিক ৮৪ ভাগ। এর মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার প্রায় ছয় কোটি মানুষের ভাগ্যে পরিবর্তন আনবে পদ্মা সেতু।

একসময় দেশের উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা দেখা দিত। এখন মঙ্গার কথা আর তেমন একটা শোনা যায় না। বঙ্গবন্ধু সেতু উত্তরাঞ্চলের এই মঙ্গা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ঠিক একইভাবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো এখনও শিল্পের দিক দিয়ে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। এ এলাকার বেশ কয়েকটি জেলার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে সবার আগে উপকার হবে এই পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর। কারণ পদ্মা সেতুর কল্যাণে ওইসব এলাকায় ব্যাপক আকারে শিল্পায়ন হবে, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। মানুষের আয় বাড়বে এবং জীবন-জীবিকায় পরিবর্তন আসবে। ২০৩৫-৪০ সালে বাংলাদেশ যে উন্নত দেশ হবে, সে ক্ষেত্রে এই সেতু নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বপ্নের এই সেতুকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। সোনালি স্বপ্ন এখন কল্পনা নয়, সত্যিই দৃশ্যমান। অনেক স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।

পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সম্ভাবনা ছাড়া আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।