ফোকাস রাইটিং : করোনা যুদ্ধে বাংলাদেশ

ফোকাস রাইটিং : ব্লু ইকোনমি
Content Protection by DMCA.com

ফোকাস রাইটিং
করোনা যুদ্ধে বাংলাদেশ

ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রাক্কালে ৬০’র দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কলেরা জীবাণুর মাধ্যমে জীবাণু যুদ্ধের বিস্তারের জন্য ব্যাপক গবেষণা করছিল ঢাকার মহাখালীর সিয়োটা কলেরা ল্যাবরেটরিতে, যা বর্তমানে আইসিডিডিআরবি নামে বিশ্বখ্যাত।

সেই আইসিডিডিআরবির তথ্য মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর যে ভ্যারিয়ান্টটা পাওয়া গেছে সেটা দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়ান্ট। কথিত আছে প্রাণী থেকে করোনা ভাইরাস ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে চীনের উহান প্রদেশে মানুষের মাঝে সংক্রমিত হয়। সার্স ভাইরাস ৩৮৪ বার পরিবর্তিত হয়ে নভেল করোনা কোভিড-১৯ রূপে আত্মপ্রকাশ করে।

বর্তমানে আবারো বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংক্রমণ কিছুটা স্থিতিশীল হলেও স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং জনগণের উদাসীনতায় পুনরায় মাসুল দিতে হচ্ছে চরমভাবে। অতীতের সব পরিসংখ্যান পিছনে ফেলে সর্বশেষ ১৪ এই এপ্রিল আইইডিসিয়ার এর তথ্য মতে ৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা সত্যিই ভয়ের।

এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় সামনে কাল বৈশাখী ঝড়ের মতোই আসছে করোনা ঝড়। যে ঝড় সামলানো অনেক কঠিন কাজ। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, (আইসিডিডিআরবির) এক তথ্যে বলা হয়েছে, নতুন আক্রান্তদের ৮১ শতাংশই হলো দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়ান্ট। এছাড়া যুক্তরাজ্যে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসের নতুন ধরনটিরও উপস্থিতি আগেই নিশ্চিত হওয়া গেছে বাংলাদেশে।

সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে আইসিডিডিআরবির ইমেরিটাস বিজ্ঞানী এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভ্যাকসিন বিষয়ক বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ড. ফেরদৌসী কাদরী বলেন, ‘আমরাতো দেখতেই পাচ্ছি ভ্যারিয়ান্টগুলো কী তাড়াতাড়ি স্প্রেড করেছে, যুক্তরাজ্য থেকে আরম্ভ হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সব জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। এগুলোর ইনফেকশন রেট হায়ার, ট্রান্সমিশন অনেক হাই তবে সিভিয়ারিটির বিষয়টা আরো গবেষণা করে বলতে হবে।’

যেহেতু নতুন এই ভ্যারিয়ান্ট এর সংক্রামিত করার ক্ষমতা অতীতের ভ্যারিয়ান্ট এর থেকেও বেশি সুতরাং সরকারকে মানুষজনকে বাঁচাতে ১৪ এপ্রিল থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত কঠোর লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এখন কথা হচ্ছে কতটুকু সুফল পাব আমরা এই লকডাউন থেকে। কিংবা প্রথম ৭ দিন যে কথিত লকডাউন পালিত হলো সেটার সুফল কি পেলাম আমরা?

সুফলের কথা চিন্তা করলে ১ম সাত দিনের (৫ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল) কথিত লক ডাউনের প্রাপ্তির খাতা কিন্তু শূন্য! মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৪ এপ্রিল ১১ দফা নির্দেশনা জারি করে লকডাউন দেয় ৫ এপ্রিল থেকে। এর আগে সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত ১৮টি নির্দেশনা জারি করা হয়।

কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা এবং স্ববিরোধী নানা সিদ্ধান্তে ঘোষিত লকডাউন কার্যত তামাশার লকডাউনে পরিণত হয়। বইমেলা ও বাংলাদেশ গেম চালু রেখে গণপরিবহন ও মার্কেট বন্ধ রাখায় ব্যবসায়ীরা রাজপথে নামে। সরকার পরে গণপরিবহন চালু এমনকি মার্কেটও চালুর ঘোষণা দেয়। অথচ বিশেষজ্ঞরা প্রথম থেকেই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে কঠোরভাবে একটানা ১৪ দিন লকডাউনের পরামর্শ দিচ্ছেন।

যদিও বা রাষ্ট্রে ১৪ এপ্রিল থেকে ২১ এ এপ্রিল পর্যন্ত কঠোর লক ডাউন চলছে। এখন সেটার শতভাগে কার্যকর হওয়া অত্যাবশকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সত্যিকার অর্থে লকডাউন বাস্তবায়ন করতে না পারলে কোন সুফলই পাওয়া যাবে না। শুধু শুধু অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে আনা হবে। তাই শত ভাগ লকডাউন বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।

গত ১ বছর যাবৎ প্রস্তুতির কথা শুনে আসলেও প্রস্তুতির ভাণ্ডার যে পর্যাপ্ত তা বলা যাবে না। প্রথম ঢেউয়ে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক সংকটকে মোকাবিলা করতে হয়েছে সেটা ছিল সাধ্যাতীত। তার মধ্যেও যতটা পারা যায় বাংলাদেশ করেছে। তবে একটা বিষয় মাথায় রেখে বলতে হবে তাহলো করোনা সম্বন্ধে আমাদের দেশের জনস্বাস্থ্য বিষয়ে যারা কাজ করেন তাদের ধারণাও সীমিত ছিল।

ফলে কোথায় কি করতে হবে সেটাও জানা হয়েছে অভিজ্ঞতা থেকে। আজ বাস্তবে যে পরিস্থিতি আমরা দেখছি তাহলো, আমাদের কিছুই নেই। পর্যাপ্ত আইসিইউর এর কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু কেন হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার নেই। তবে হচ্ছে, ধীরে সবই হচ্ছে। বিদেশে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে আজ সবাই নিজের হাসপাতালের অসামর্থ্য নিয়ে লিখছেন।

কোনোদিন নিজের দেশের হাসপাতালটা দেখেছেন। গত বছর ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে বসুন্ধরায় করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছিল। বছর না শেষ হতেই কেন উধাও সেই হাসপাতাল? কেন ডিএনসিসিতে নির্মিত হাসপাতালটি ফেলে রেখে তার উপরের তলায় নতুন করে নির্মিত হচ্ছে আবারো হাসপাতাল?

এই সব কেন এর উত্তর খুঁজতে গেলে মহাকাশ বিজ্ঞানী হতে হবে না। বেসিক সাধারণ জ্ঞান এপ্লাই করলেই এর উত্তর মিলবে। ওপর মহলের এক শ্রেণি নিজেদের স্বার্থে নিজের পকেট ভরতে এমন সব কাজ করে যাচ্ছে যা বলাও দুষ্কর। সরকারের উচিত এই সব কিছুতে কড়া নজরদারি করা। না হলে শুধু শুধু হাসপাতাল নির্মাণ করে কোনো লাভ হবে না।

করোনা ভাইরাসের মহামারী ঠেকাতে বড় জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনাটা গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশে এরই মধ্যে টিকার ২য় ডোজের প্রয়োগ শুরু হয়েছে। ৭ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক টিকা কর্মসূচি শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৫৫ লাখের বেশি মানুষ প্রথম ডোজের টিকা গ্রহণ করেছে। এই মহামারী মোকাবিলায় টিকাদান কর্মসূচি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বের অনেক দেশের আগে বাংলাদেশ টিকা কার্যক্রম শুরু করেছে এটা সত্যি। তবে এ ব্যাপারে আরো তৎপরতা প্রয়োজন। ভ্যাকসিনের অভাবটা কিন্তু পৃথিবীজুড়ে। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়। তারপরেও আমরা কিনে এনেছি, গিফট পেয়েছি এবং কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটিতে পাব। তিনটা মাধ্যমে পাচ্ছি। কিন্তু এরপরও আমাদের বসে থাকার সুযোগ নেই।

আমাদেরকে টিকার জন্য আরো চেষ্টা করতেই হবে। যদি সম্ভব হয় এই মহামারী মোকাবিলায় টিকার উৎপাদনের সক্ষমতা কাজে লাগানো দরকার। বাংলাদেশে বেশ কিছু ওষুধ কোম্পানির উৎপাদন সক্ষমতা আছে, যা কাজে লাগানোর মোক্ষম সময় এটি। আমার মনে হয় এ বিষয়ে সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের বিষয়টি আমলে নেয়া উচিত। কি করে টিকা উৎপাদন করে এই বিশাল জন গোষ্ঠীর মাঝে ছড়িয়ে দেয়া যায় সেটা নিয়ে কাজ করা উচিত।

আমাদের সক্ষমতা আছে, এক্সপার্টিজ আছে। সবই আছে। আমার মনে হয় আমাদের আরেকটু চেষ্টা করতে হবে যে কীভাবে আমরা আনবো বাংলাদেশে। কীভাবে জোর করে আনব বাংলাদেশে। এদিকে টিকা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ দেশই একাধিক ভ্যাকসিনকে তাদের কর্মসূচির আওতায় রেখেছে। তবে বাংলাদেশকে এখন পর্যন্ত একমাত্র অক্সফোর্ডের টিকার ওপর নির্ভর করেই এগোতে দেখা যাচ্ছে।

কাজেই করোনার টিকা, যেটা কিনা বর্তমান সময়ের ব্রহ্মাস্ত্র সেটার ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মানা লকডাউনে ঘরে থাকার বিকল্প নেই। দেশের এই দুঃসময়ে সবার এগিয়ে আসা জরুরি। বাংলাদেশ আজ যে যুদ্ধ করছে সে যুদ্ধ আমাদের সবার। এটা মনে রাখলেই হবে। দেশের হয়ে সবাই একযোগে কাজ করলে জয় আমাদের সুনিশ্চিত। দুঃসময়ের তীব্রতা বেশি কিন্তু স্থায়িত্ব কম। এসব কথা মাথায় রেখেইে করোনা যুদ্ধ করতে হবে।

লেখক: হেলথ অফিসার, গুড নেইবারস বাংলাদেশ (আন্তর্জাতিক সংস্থ)।

করোনা যুদ্ধে বাংলাদেশ ছাড়া আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন।