চীনের আক্রমণাত্মক উলফ ওয়ারিয়র কূটনীতি

ফোকাস রাইটিং FOCUS WRITING
Content Protection by DMCA.com

বিসিএস ও ব্যাংক
ফোকাস রাইটিং
আন্তর্জাতিক রাজনীতি
চীনের আক্রমণাত্মক উলফ ওয়ারিয়র কূটনীতি

একুশ শতকে এশিয়ার দেশ চীনের পরাশক্তি হিসেবে উত্থান বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। সাতদশক আগে যে চীন ছিল কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা, যে দেশটি প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করত নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সাথে আজ সেই দিশটিই পৃথিবীর অন্যতম অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিগুলোর একটি।

একুশ শতকের রাজনৈতিক মঞ্চের অন্যতম খেলোয়ার সেই চীন, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার মতদেশগুলা তার প্রতিপক্ষ। চীনের এই অভুতপূর্ব উত্থান কেবল বিশ্ববাসীকে হতচকিত করছে তা নয় বরং বিশ্বরাজনীতির গতিপ্রকৃতির পরির্বতন করে দিয়েছে।

বিশ্বের তাবৎ পরাশক্তি যখন করোনা মহামারীকে মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে তখনও চীন এক অদৃশ্য শক্তির বলে এই মহামারীকে নিয়ন্ত্রণে এনে তার অগ্রয়াত্রাকে অব্যহত রেখেছে। দূরপ্রাচ্যের এই দেশটি যখনবৈশ্বিক সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেকে অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে তখন কূটনৈতিক অবস্থানকে সুসংহত করতে পূর্বের প্রথাগত রক্ষণাত্মক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন আক্রমণাত্মক ধারার কূটনীতি ‘উলফ ওয়ারিয়র কূটনীতি গ্রহণ করেছে।

চীনের এই নতুন কূটনৈতিক ধারাকে বলা হচ্ছে প্রায়োগিক, প্ররোচক এবং ঊচ্চ পর্যাযের পর-রাষ্ট্রনৈতিক কৌশল যা তার পূর্বের রক্ষণাত্মক ও সহিষ্ণু কূটনৈতিক ধারার বিপরীত। এখন প্রশ্ন হলো, কি এই চীন এর উলফ ওয়ারিয়র ডিপ্লোমেসি আর কেনই বা চীন রক্ষাণাত্মক কূটনীতির পরিহার করে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে।

চীনের উলফ ওয়ারিয়র কূটনীতি কি?

২০১৫ ও ২০১৭ সালে চীনা জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষপটে নির্মিত হয় দুটি চীনা চলচ্চিত্র উলফ ওয়ারিয়র ও উলফ ওয়ারিয়র ২। চলচ্চিত্রদুটি ব্যাপক সাড়া ফেলে চীনে, মিলিয়ন ডলারের ব্যবস্যা করে নির্মাতা উ জিং এর এই সিনেমা ।

সিনেমার গল্পে দেখা যায় চীনের পিপলস রিপালিক আর্মির এজেন্ট চীনের বাইরের শত্রুদের বিরুদ্ধে রুদ্ধশ্বাস অপারেশন চালিয়ে চীন বিরোধী কর্মকাণ্ড নস্যাৎ করে চীনের জাতীয় শক্তি বৃদ্ধি করছে। এই চলচ্চিত্র দুটি থেকে অনুপ্রেরণিত হয়ে চীনা কতৃপক্ষ উলফ ওয়ারিয়র কূটনীতি গ্রহণ করেছে। আর চীনের স্বার্থ রক্ষার্থে চীনের এক এক জন কূটনীতিক হয়ে উঠছেন উলফ ওয়ারিয়র।

মূলত তারা বিশ্ববাসীকে জানান দিতে চাই, চীন আর আগের মত নমনীয় নয়, শত্রুর কাছে নিজের সক্ষমতা গোপন করে নয় বরং প্রকৃত সক্ষমতা জানান দিতেই তৎপর। আর এরই মাধ্যমেই চীনের দেও জিয়াওপিং এর তাওগুয়াং ইয়াংহুই কূটনৈতিক যুগের অবসান হচ্ছে। মূলত দেও জিয়াওপিং এর এই নীতিই ছিলো প্রতিপক্ষের কাছে নিজের সক্ষমতাকে গোপন রাখা।

কেন চীন এই কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বন করছেঃ

চীনের কূটনীতিক ধারার হঠাৎই যে পরিবর্তন এসেছে ব্যাপারটা এমন নয়। বরং ২০১০ সালে চীন যখন জাপানকে অতিক্রম করে জিডিপি হিসেবে পৃথিবীর দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় তখন থেকেই চীন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে এবং পররাষ্ট্রনীতিতে প্রায়োগিক ও প্রত্যয়ী আচরণ শুরু করে।

এর পূর্বে চীন দেও জিয়াওপিং এর ‘তাওগুয়াং ইয়াংহুই’ নীতি অনুসরণ করত। যা মূলত ছিল প্রতিপক্ষ বা শত্রুকে নিজের সক্ষমতা প্রদর্শন না করা। তাকে ভালভাবে বুঝিয়ে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে সমস্যার সমাধানের লক্ষে আলোচনা করা।

কিন্তু বর্তমানে চীনা কূটনৈতিকরা কেবলই যে উলফ ওয়ারিয়র কূটনীতি অনুসরণ করে প্রতিপক্ষের সাথে বাকযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে তা নয় বরং আক্রমনাত্মক আচরণও করছে। যার প্রমাণ পাওয়া যায় এপ্রিলের শুরুতে চীন দক্ষিণ চীন সাগরের প্যারাসেলস আইল্যান্ডের কাছে ভিয়েতনামের একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবিয়ে দেয়।

ভিয়েতনাম এই ঘটনার প্রতিবাদ করলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক টুইট বার্তায় জানিয়ে দেওয়া হয় যে ভিয়েতনামের দাবীকৃত অঞ্চল সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। চীনের এই যে আগ্রাসনের কূটনীতি তা মূলত তার জাতীয় শক্তিকে সুসংহত করার জন্য।

চীনের তার প্রতিবেশী সহ বিশ্বের বাকীদেরকে স্পষ্টত বার্তা দিতে চাই জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় অনড় সে। যদি তার জাতীয় স্বার্থে কোন দেশ আঘাত হানে তাহলে চীন ছাড় দিবে না। পূর্বে সে অন্যের কাছে শক্তিমাত্তা প্রদর্শনে আগ্রহী ছিল না কিন্তু এখন সে তার শক্তি সামর্থ্য জানান দিতে আগ্রাসী হয়ে উঠছে কূটনীত ও পররাষ্ট্রনীতিতে।

দ্বিতীয়ত, চীন তার উত্থানের প্রকৃত গল্প বাকীদের বলতে চাই। যত দ্রুতই চীনের উত্থান হচ্ছে, অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী হচ্ছে ততই পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষত শক্তিধর দেশগুলো, চীনের এই উত্থানকে হুমকী হিসেবে দেখছে। এই দেশগুলো চীনের আবির্ভাবকে মেনে নিতে কেবলই যে প্রস্তুত নয় তা নয়, বরং আগ্রহীও নয়। আর তাই তারা চীনের নামের প্রপাগাণ্ডা ছড়ায়।

পশ্চিমা মিডিয়াগুলো বায়াস,তার চীন বিরোধী সংবাদ প্রকাশ করে বলে অধিকাংশ চীনা নাগরিক মনে করেন। মূলত উলফ ওয়ারিয়র কূটনীতির দ্বারা চীন বিশ্ববাসীর সামনে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে চাই। করোনা ভাইরাস অতিমারী চলাকালীন সময়ও চীন এই কূটনৈতিক পন্থার দ্বারা করোনা মোকাবিলায় সে যে অগ্রগামী ও পরাশক্তি তা বোঝানোর চেষ্টা করে চলেছে।

চীনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী উলফ ওয়ারিয়র ডিপ্লোমেসি হলে চীনের প্রতি অন্যান্য দেশগুলোর শত্রুতার ও অন্যাযতার মোক্ষম জবাব, বিশেষত মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যাই এই বছরের শুরুতে চীন ও মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র একে অপরে সাংবাদিক বহিষ্কারের প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়।

ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের মতামত বিভাগে চাইনা ইজ দ্যা রিয়েল সিক ম্যান অফ এশিয়া নামের কলাম প্রকাশের পর ওয়ালস্ট্রিট কতৃপক্ষ ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানালে চীন তাদের তিনজন সাংবাদিক চীন থেকে বের করে দেয়।

এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ অল্প সময়ের ব্যবধানেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের পাচটি মিডিয়া আউটলেটকে তাদের কর্মকর্তাদের নিবন্ধন করার নোটিশ দেয় এবং কর্মকর্তাদের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। এরও প্রতিক্রিয়া জানাতে চীন আরো আমেরিকান সাংবাদিকদের তাদের দেশ থেকে বের করে দেয়।

তৃতীয়ত, চীন তার জাতীয় শক্তি ও নমনীয় শক্তি (Soft power) সক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে এই কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বন করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের সর্বদা কূটনীতিক লড়াই বিরাজ মান। তার একে অপরকে দোষারোপের খেলায় নিযোজিত যখন তাদের করোনা ভাইরাসের মত বিষয় মোকাবেলা করতে একত্রে কাজ করা উচিত ছিলো।

জাতি হিসেবে চীন প্রাচীন ঐতিহ্য ও সভত্য ও সম্মৃদ্ধির অধিকারী তাই চীনের উচিত নিজেকে বিনয়ী, পরোপকারী আর মহানুভব হিসেহে গড়ে তোলা। কিন্তু এক্ষেত্রে বাধা সেই পশ্চিমা শক্তি সমূহের চীনা বিরোধী মনোভাব, যারা মনে করে চীনের রাজনৈতিক, মতাদর্শ ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা পৃথিবী বাকী দেশগুলার জন্য হুমকী স্বরুপ। আর তাই চীন তার নমনীয় শক্তি আর জাতীয় শক্তি সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুজে বের করতে চাই।

বিংশ শতকে যে চীন ছিলো কৃষিপ্রধান দেশ, অর্থনীতিতে মাঝারি মানের দেশ, এক একবিংশ শতকে সেই চীন পরাক্রমশালী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। চীন পূর্বের তার সেই প্রথাগত নমনীয় কূটনীতি থেকে বেরিয়ে এসে আগ্রাসী কূটনীতি অনুসরণ করছে তার জাতীয় শক্তিকে সুসংহত করতে, বিশ্বব্যাপী চীনের প্রতি যে নেতিবাচক মনোভাব আছে তা বদলে দিতে।

চীনা কূটনৈতিকদের প্রত্যেকে আজ এক একজন উলফ ওয়ারিয়র যারা জাতীয় স্বার্থের জন্য প্রতিপক্ষকে ছাড় দিতে নারাজ। এখন দেখার বিষয় চীনের এই আগ্রাসী কূটনীতি তথা পররাষ্ট্রনীতি কতটা চীনের উত্থানের পথকে সুসংহত করে একবিংশ শতকের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে।

তথ্য সূত্র : দ্যা রিফর্রমার পেইজ

চীনের আক্রমণাত্মক উলফ ওয়ারিয়র কূটনীতি ছাড়া আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।